বিশেষ প্রতিবেদক->>

একাত্তরের নভেম্বর থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র আক্রমণের মুখে পিছু হটতে থাকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি আত্মসমর্পণের ঘটনা ঘটে। বিজয়ের মাসে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা হবে

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আত্মসমর্পণপর্বে পৌঁছাতে বাঙালিকে অনেক রক্ত দিতে হয়েছে। অদম্য সাহস আর অসামান্য ত্যাগের মানসিকতা সম্বল করে নামা সেই যুদ্ধে ফেনীর বিলোনিয়ায় পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণ ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নধারীদের জন্য আশাজাগানিয়া খবর। তুমুল এক যুদ্ধ শেষে ১০ নভেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৭২ জন সৈনিক আত্মসমর্পণ করেছিল।

সেই যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বাঙালি সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাফর ইমাম। প্রচলিত যুদ্ধরীতির বাইরে গিয়ে সাজানো হয়েছিল রণকৌশল।
জাফর ইমাম বলেন, একাত্তরের নয় মাসে বিলোনিয়ার পাশাপাশি সালদা নদী, হিলি, গঙ্গাসাগর ও জামালপুরসহ অনেক সম্মুখযুদ্ধ হয়েছিল। সেসব যুদ্ধের রণকৌশল এখনো ভারত-বাংলাদেশের সামরিক স্কুলে পড়ানো হয়। তিনি বলেন, যাঁরা রণাঙ্গনে সম্মুখ ও গেরিলা যুদ্ধ করেছেন, তাঁদের মাধ্যমে যুদ্ধের সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে জানানোর এখনো সুযোগ আছে।

বিলোনিয়া এলাকাটি ফেনী জেলার পরশুরাম উপজেলায়। ওপারে ভারতের ত্রিপুরা। বর্তমানে এটি একটি স্থলবন্দর। ওপারের জায়গাটির নামও বিলোনিয়া।

একাত্তরের যুদ্ধক্ষেত্র বিলোনিয়া উত্তর-দক্ষিণে দৈর্ঘ্যে ১৬ মাইল আর পূর্ব-পশ্চিমে প্রস্থে ছয় মাইল। এলাকাটি তিন দিক দিয়ে ভারতঘেরা। দেখতে অনেকটা উপদ্বীপের মতো। এর ভেতর দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে বয়ে গেছে মুহুরী নদী।

দেশের ভেতরে একটি দপ্তর স্থাপনের জন্য মুক্তিবাহিনীর শীর্ষ কমান্ডাররা বিলোনিয়াকে বেছে নিয়েছিলেন। এখানে দুটি বড় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। প্রথম যুদ্ধটি হয় জুন-জুলাই মাসে; প্রায় দেড় মাস স্থায়ী হয়। তাতে ৩৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। পাকিস্তান বাহিনীর ৩০০ জন হতাহত হয়। পরে মুক্তিবাহিনী কৌশলগত কারণে দুই মাইল পেছনে গিয়ে মুহুরী নদীর তীরে ঘাঁটি করে।

দ্বিতীয় যুদ্ধটি ছিল ভয়াবহ। এর অনুপুঙ্খ বর্ণনা পাওয়া যায় যুদ্ধে অংশ নেওয়া লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাফর ইমাম, মেজর জেনারেল ইমাম-উজ-জামান ও মেজর জেনারেল গোলাম হেলাল মোরশেদ খানের লেখায়। তিনজনই বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা।

বিলোনিয়া যুদ্ধ নিয়ে এই তিনজনসহ তাঁদের বেশ কয়েকজন সহযোদ্ধার স্মৃতিকথা প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন বই ও সংকলনে। তাতে ওই যুদ্ধের অনুপুঙ্খ বর্ণনা ফুটে উঠেছে। ১৯৭১ সালের ৫ নভেম্বরকে আক্রমণের দিন ঠিক করে প্রস্তুতি নিয়েছিল মুক্তিবাহিনী। ৪ নভেম্বর মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে রাতের অন্ধকার ফুঁড়ে মুক্তিবাহিনী ঢুকে পড়ে অপারেশন এলাকায়। সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট মিজানের নেতৃত্বে ব্রাভো কোম্পানি এবং সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট দিদারের নেতৃত্বে চার্লি কোম্পানি প্রথমে অগ্রসর হয়। চার্লি কোম্পানির পেছনে ছিল ক্যাপ্টেন মোরশেদের নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গলের একটি কোম্পানি। এর পেছনে ছিলেন এই যুদ্ধের অধিনায়ক মেজর জাফর ইমাম। লেফটেন্যান্ট ইমাম-উজ-জামানের নেতৃত্বাধীন আলফা কোম্পানি মুহুরী নদীর পূর্ব পারে ধনিকুণ্ডা এলাকায় অবস্থান নেয়। এই দলগুলো শত্রুর প্রতিরক্ষা অবস্থান ফাঁকি দিয়ে মুহুরী নদী পার হয়ে সলিয়ায় যায়। এই সলিয়াতেই হয়েছিল সম্মুখযুদ্ধ, যেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে।

৬ নভেম্বর সকালে একটি রেল-ট্রলিতে করে পাঁচজন জওয়ানসহ পাকিস্তানি একজন অফিসার সলিয়ার দিকে যাওয়ার সময় ব্রাভো কোম্পানির হাবিলদার এয়ার আহাম্মদের এলএমজির আওতায় চলে আসে। মুহূর্তেই এয়ার আহাম্মদ ট্রলিটি ঝাঁজরা করে ফেলেন। সব পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। এয়ার আহাম্মদ এতই উত্তেজিত হয়ে পড়েন যে তিনি পরিখা ছেড়ে ট্রলির দিকে ছুটতে থাকেন। ইতিমধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রতি-আক্রমণ করে এবং এয়ার আহাম্মদ শহীদ হন। এয়ার আহাম্মদের রক্তের ওপর দিয়ে চলা সেই যুদ্ধ কয়েক দিন মাত্র স্থায়ী হয়। ক্ষুদ্রাস্ত্র, মর্টারের গোলা, ১০৬ মিমি রিকয়েললেস রাইফেল, জঙ্গিবিমান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েও শেষরক্ষা হয়নি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর।
ভারতীয় ৮৩ মাউন্টেন ব্রিগেড সীমান্ত বরাবর সমবেত ছিল। কিন্তু ৯ নভেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রতিরোধ করে যাচ্ছিল। এ অবস্থায় যৌথ বাহিনী সর্বাত্মক ও সমন্বিত আক্রমণে যায়। তুমুল যুদ্ধের পর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। ১০ নভেম্বর ভোর নাগাদ সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হয় বিলোনিয়া। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২০০ জন হতাহত হয়। দুজন অফিসারসহ ৭২ জন পাকিস্তানি সৈনিক আত্মসমর্পণ করে মুক্তিবাহিনীর কাছে। এ যুদ্ধে যৌথ বাহিনীর ১৩৭ জন শহীদ হন।

মেজর জেনারেল ইমাম-উজ-জামান প্রথম আলোকে বলেন, সেদিন যৌথ বাহিনীর সম্মিলিত অভিযানের কারণেই ওই বিজয় অর্জন সম্ভব হয়েছিল। যৌথ বাহিনীর কাছে এটিই ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রথম আত্মসমর্পণ। বিলোনিয়া জয়কে চূড়ান্ত স্বাধীনতা অর্জনের প্রথম ধাপ বলা যায়।

চালনা বন্দরের একজন সাধারণ কর্মী থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিলোনিয়া যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন কাজী আবুল কাশেম। পরশুরামের উত্তর গুথুমা গ্রামের (যুদ্ধের সময় বয়স ১৬-১৭) আবুল কাশেম গতকাল সোমবার প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন। দুই মেয়ে, তিন ছেলের জনক কাশেম এখন একজন বাবুর্চি। ৪ নভেম্বর ১৯৭১ সালের বিবরণটা দিলেন এভাবে: প্রচণ্ড বৃষ্টি, অন্ধকার রাত। খেতের পাকা ধান পানিতে ভাসছে। সামনে সেনাবাহিনী, ইপিআরের সদস্যরা। তাঁদের পেছনে নতুন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে হাতে চায়নিজ রাইফেল নিয়ে আবুল কাশেম। তিনি ছিলেন ক্যাপ্টেন মাহফুজের কোম্পানিতে।

টানা যুদ্ধ এবং বিজয়। ৫০ বছর আগের অনুভূতিটা এখনো ক্ষয়ে যায়নি। বললেন, ‘মনে হলো আমরা স্বাধীন দেশে বাস করব। শত শত মানুষ ছুটে এল আমাদের দেখতে। এর চেয়ে বড় আনন্দের আর কী আছে?’

আর আজকের অনুভূতি জানতে চাইলে বললেন, ‘সেই বিজয়ের কথা মনে পড়লে বিলোনিয়ার স্মৃতিস্তম্ভে যাই। সহযোদ্ধাদের কথা মনে পড়ে। আমি চাই এই স্মৃতিস্তম্ভে মানুষ আসুক। বাচ্চারা জানুক, এখানে সম্মুখযুদ্ধ হয়েছিল। পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করেছিল।’

সূত্র : প্রথম আলো

Sharing is caring!