বিনোদন প্রতিবেদক->>

ফেনীতে একাত্তরের গণহত্যা ও বধ্যভূমির ওপর নির্মিত নাটক ‘গোলপোস্ট’ মঞ্চস্থ হয়েছে। রোববার রাতে শহরের ফেনী সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে জেলা শিল্পকলা একাডেমির রেপার্টরি নাট্যদলের পরিবেশনায় গণহত্যা পরিবেশ থিয়েটারের নাটক ‘গোল পোস্ট’ মঞ্চায়িত হয়।

মুজিবশতবর্ষ ও স্বাধীনতা সূবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ও নাট্যজন লিয়াকত আলী লাকির ভাবনা ও পরিকল্পনায় গোলপোস্ট নাটকটির রচনায় ছিলেন আসাদুল ইসলাম। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় নাটকটির পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় ছিলেন আবুল কালাম আজাদ (সেতু)।

গোলপোস্ট নাটকের নির্দেশক সেন্টার ফর এশিয়া থিয়েটার (সিএটি) নাট্যব্যক্তিত্ব আবুল কালাম আজাদ (সেতু) জানান, স্বাধীনতার জন্য আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান অনস্বীকার্য। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ফেনী কলেজ ছিলো পাকবাহিনীর অন্যতম ক্যাম্প আর টর্চার সেল। কলেজের গোলপোস্ট ছিলো তাদের অত্যাচার করার অন্যতম একটা জায়গা। কতশত জানা অজানা মানুষ এই কলেজ এর বধ্যভুমিতে শহীদ হয়েছে তা আজও অজানা। বাংলাদেশের জন্য কিছু অতি সাধারন মানুষের আত্মত্যাগের কাহিনী, পাক বাহিনীর ঘৃন্য যুদ্ধ পরিকল্পনা নিয়েই গোলপোস্ট নাটক মঞ্চায়ন করা হয়েছে।

প্রবীণ নাট্য ব্যক্তিত্ব সুবচন নাট্য সংসদের সমন্বয়কারী নাসির উদ্দিন সাইমুম জানান, নাটকটিতে মুক্তিকামি মানুষকে হত্যার পাশাপাশি ’৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে ফেনীর হিন্দু অধ্যসুতি পাড়ায় হামলা করে নারীদেরকে নির্যাতন করে হত্যা করার দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ফেনীর একঝাক তরুণ নাট্যকর্মী সাবলিল অভিনয়ে নাটকটি দর্শকদেন মন কেড়ে নিয়েছে।

ফেনীর বিলোনিয়া যুদ্ধে সম্মুখ সারির মুক্তিযোদ্ধা ও ফেনী জেলা মুক্তিযোদ্ধা কর্মন্ডার (সাবেক) আবদুল মোতালেব জানান, ‘নাটকটি চলকালে যেন একাত্তরের যুদ্ধে ফিরে গিয়েছিলাম। পরিচালক যেভাবে নির্যাতনের চিত্র নিখুতভাবে ফুটিয়ে তুলেছে তা প্রশংসার দাবিদার। কয়েকটি চিত্র যেন চোখের কোন পানি জমিয়ে দিয়েছিলো।’

ফেনী থিয়েটারের সমন্বয়কারী (সাবেক) কাজি ইকবাল পরান জানান, নাটকের মাধ্যমে সমাজের অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরা হয়। করোনা পরবর্তী ঝিমিয়ে পড়া সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন পর এমন একটি দর্শক নন্দিত নাটক প্রশংসার দাবি রাখে।

নাট্য সংগঠক নাজমুল হক শামীম জানান, ফেনীর ইতিহাসে ফেনী কলেজের মুলভবনকে মঞ্চবানিয়ে এতবিশাল মঞ্চে মুক্তিযুদ্ধে এমন নাটক জেলায় প্রথম মঞ্চায়িত হয়েছে। শীতের রাতে একাধিক নারী ও শিশুর বলিষ্ঠ অভিনয় দর্শক হিসেবে মন ছুয়েছে।

ফেনী জেলা কালচারাল অফিসার এস এম টি কামরান হাসান জানান, জেলা শিল্পকলা একাডেমীর নাট্য বিভাগের সদস্যসহ জেলার আরও কয়েকটি নাট্য সংগঠনের প্রায় অর্ধশতাধক শিল্পীর দীর্ঘ এক মাসের পরিশ্রমে নাটক ‘গোল পোস্ট’ নাটকটি মঞ্চায়িত হয়েছে। নির্দেশক আবুল কালাম আজাদ (সেতু) এর পাশাপাশি সহকারী নির্দেশক কাবেরী জান্নাত নাটকটি মঞ্চে তুলতে নিরশল পরিশ্রম করেছেন।

ফেনী জেলা প্রশাসক আবু সেলিম মাহমুদ-উল হাসান নাটকের শেষ অংশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কমান্ডারের উক্তিটি তুলে ধরে বলেন, ‘মুক্তিবাহিনীর আক্রমনে ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় হানাদার কমান্ডর বলেছে ‘‘আমরা পাকিস্তানির বিজ বুনে দিয়ে গেলাম। তারাই আগামীতে আমাদের ঝান্ড ওড়াবে।’’ সেই বিজবুনে যাওয়া গুটিকতেক ব্যক্তির কারনে স্বাধীনতার এত বছর পরও দেশের উন্নয়নে বাধাগ্রস্থ করতে চেষ্টা চলাচ্ছে একটি মহল। তাদের থেকৈ আমাদের সজাগ থাকতে হবে।’

নাটক শুরুর পূর্বে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ও নাট্যজন লিয়াকত আলী লাকি নাটক প্রদর্শনীটি অনলাইনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে উদ্বোধন করেন।

নাটকে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন; আবদুর রউফ, আব্দুর রহমান মিঠু, হিমেল পাটোয়ারী, মো. রকিবুল ইসলাম, সুরঞ্জিত নাগ, বিজয় নাথ, আরাধ্য শীর, অথৈ মিত্র, সাজ্জাদুল ইসলাম, নাজমুন নাহার, মো. সাজ্জাতুল ইসলাম সানি, বিন্দু বণিক, মো. মির্জান হোসেন, তন্ময় নাথ টিটু, সাব্বির আাহাম্মদ রামিন, ইকবাল হাসান বিজয়, আবদুল্লাহ আল রাজী, সুব্রত দেব নাথ, নামজাদা হীবব আনোয়ার, মো. আইনুল ইসলাম, শারদ রায় নির্জর, মো. আবদুল কাদির, তানজিনা আক্তার জেরিন, আবদুল মালেক, মো. মাজিদুল হক ইরফান, সুপ্রভা দাস, অদ্রিজা দাস, অনন্যা রাণী দাস, অঙ্কুর ভৌমিক, হৃদয় মজুমদার, রাফিকা আফরা, মো. আজিজুল হক, তিথী চক্রবর্তী, রুনু চক্রবর্তী, নাহিদ হাসান, হৃদয় রঞ্জন দাস, জামিলা হক দিহানা, শ্রেয়া সরকার, গুঞ্জন সরকার, অমিত মজুমদার, মো. ইয়াছিন আরাফাত, বিবি আয়েশা বেগম, পূর্ণ্যতা শর্মা, রাজশ্রী পোদ্দার, মো. শরীফ হোসেন মাসুম, ফাতেমা জান্নাত, মো. আব্দুল্লাহ আল ফরহাদ, শাহরিয়ার ফারিক, যারিন ইরতিজা খানমসহ ফেনী জেলার স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিল্পীরা।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মাসুদুর রহমানের সভাপতিত্ব নাটক পরবর্তী সভায় বক্তব্য রাখেন ফেনী জেলা প্রশাসক আবু সেলিম মাহমুদ-উল হাসান, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক ড. মঞ্জুরুল ইসলাম, জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পিপি হাফেজ আহম্মদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মোতালেব।

এসময় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, নাট্যবক্তিত্ব, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন উপস্থিত ছিলেন।

প্রসঙ্গত, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে নাট্যজন লিয়াকত আলী লাকীর ভাবনা ও পরিকল্পনায় দেশের ৬৪ জেলার ৬৫টি বধ্যভূমিতে মঞ্চায়িত হচ্ছে গণহত্যার পরিবেশ থিয়েটারের নাটক।

Sharing is caring!