ফুলগাজী প্রতিনিধি->>

ফুলগাজীতে মহুরী নদীর ক্ষতিগ্রস্থ বেড়িবাঁধ পুনঃনির্মাণে অনিয়ম ও বরাদ্ধ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। চলতি বর্ষা মৌসুমেও টানা বৃষ্টি ও ভারতীয় উজানের পানিতে ফুলগাজীর উত্তর দৌলতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের অংশে ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ পুনঃনির্মাণ শুরু হলেও নানা অনিয়মের অভিযোগ করেছে এলাকাবাসী। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ঠিকাদারদের যোগসাজশে পরিমাপমত কাজ না করে বরাদ্ধ লোপাটেরও অভিযোগ করেছে স্থানীয় গ্রামবাসী।

এলাকাবাসী সূত্র জানায়, চলতি বর্ষা মৌসুমেও টানা বৃষ্টি ও ভারতীয় উজানের পানিতে ফুলগাজীর উত্তর দৌলতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের অংশে ভেঙে যায়। এতে ওই এলাকার কয়েকশো ঘরবাড়ি পানিতে প্লাবিত হয়। পানিবন্দি হয়ে পড়ে হাজারো মানুষ। ঘটনার পর বাঁধের মেরামত কাজ শুরু হয়। বাঁধে মাটির পরিবর্তে নদীর বিপরীত পাশ এবং ভাঙ্গনস্থানের পাশ থেকে ড্রেজার মেশিন দিয়ে উত্তোলন করা হচ্ছে বালি। বাঁধের সংস্কারে উত্তোলনকৃত বালি ব্যবহার হচ্ছে। বাঁধের সংস্কারে জিও ব্যাগের পরিবর্তে সারের বস্তা, গো-খাদ্যর ব্যাগ ও বাঁশ দিয়ে চলছে মেরামত কাজ। এতে নদীতে পানি বৃদ্ধি পেলেই পুনরায় বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা করছে এলাকাবাসী।

স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম জানান, প্রতিবছর বৃষ্টি ও পাহিাড়ি ঢলে মহুরী নদীর বেরিবাঁধের বিভিন্ন অংশ ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা উন্নয়নের গল্প শোনান আমাদেরকে। সরকারি বরাদ্দ থাকলেও দিনশেষে খুব নিম্নমানের কাজ করা হয়। ফলে নতুন করে একই স্থানে অথবা ভিন্ন ভিন্ন স্থানে আবারও ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়।

ভুক্তভোগী আব্দুর রহিম জানান, ‘নদীর ভিতরে বাঁশ গাছ কেটে সংস্কার না করার কারণে স্বল্প বৃষ্টিতেই নদীর পানি অনেক উপরে উঠে যায়। এর ফলে প্রতিবছরই বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হয়।’

আরিফুল ইসলাম নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, ‘ঠিকাদার বাঁধে মাটি ব্যবহার না করে বালি দিয়ে ভাঙা জায়গা ভরাট করা হচ্ছে। ভাঙ্গন স্থানের নিচ থেকে বালু তুলে উপরে বাধঁ নিমান করছে। যেভাবে বাঁধ মেরামত হচ্ছে ভারি বর্ষণে ফের বাঁধ ভেঙে যেতে পারে। গেল কয়েক বছর এমন নিম্নমানের কাজের করেন সম্প্রতি টানা বৃষ্টিতে ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভেঙে আমরা কয়েকশ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।’

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি সূত্র জানায়, ক্ষতিগ্রস্থ ২০ মিটার দৈঘ্য বেড়িবাঁধ মেরামত ব্যয় ধরা হয় ১৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। বাঁধ মেরামতের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাসেম ট্রেডার্স।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঠিকাদার কাসেম ট্রেডার্স অধিক লাভের আশায় কাজটি নিজে না করে সাব ঠিকাদার দিয়ে মেরামত কাজ করে যাচ্ছেন। ১৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকার মেরামত কাজের চুক্তিটি স্থানীয় ইউপি সদস্য তাজুল ইসলামের সাথে মাত্র ৩ লাখ ২০ হাজার টাকায় করেন। হাত বদলের এই মধ্যস্থতায় ঠিকাদার হাতিয়ে নিচ্ছে ১১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।

তবে ঠিকাদার আবুল কাশেম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘মেরামতকৃত বাঁধের অংশটির জন্য এখনও টেন্ডার হয়নি। তবে প্রথমিকভাবে ১৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্বাহি প্রকৌশলী আমাকে বাঁধ মেরামত করতে বলেছেন তাই কাজ করে দিচ্ছি। কাজটি আমি স্থানীয় মেম্বারকে সাব কন্ট্রাকে কাজ দিয়েছি। তিনি আরও বলেন, শিডিউলে যা বরাদ্ধ আছে সে অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে।’

সাব ঠিকাদার ও স্থানীয় ইউপি সদস্য তাজুল ইসলাম জানান, ‘৩ লাখ ২০ হাজার টাকায় কাজ করার দায়িত্ব পেয়েছি। আমাকে ঠিকাদার কাশেম সাহেব যে ভাবে বলেছে আমি সে ভাবে কাজ করছি। শিডিউলে অনুযায়ী হচ্ছে কিনা তা আমি জানিনা।’

ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল আলিম জানান, ‘বাঁধ মেরামতে অনিয়ম হচ্ছে আমি জানতে পেরেছি। ঠিকাদার জিও ব্যগের বিপরিতে খাদ্যে ব্যবহৃত পুরাতন প্লাষ্টিকের ব্যাগ ও মাটির পরিবর্তে বালিসহ নানা অনিয়ম হচ্ছে। সঠিক তদারকির অভাবে নিম্নমানের কাজে প্রতিবছরই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দারা।’

ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জহির উদ্দিন জানান, ‘ভাঙনের স্থানে মাটি দিয়ে সংস্কার করতে হবে। প্রয়োজনে ৩০ ভাগ বালু ব্যবহার করা যেতে পারে। শুধু বালু দিয়ে বাঁধ সংস্কার করা সম্পূর্ণ অন্যায়। ১৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকা বরাদ্দের মধ্যে মাটি জিও ব্যাগ, বালুসহ সবকিছু ধরা হয়েছে। সম্প্রতি কাজে অনিয়মের বিষয়টি জানতে পেরেছি। এই ব্যপারে জেলা প্রশাসকের সাথে কাথা বলেছি। কাজে অনিয়ম হচ্ছে জেনে আপাতত কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।’

Sharing is caring!