বিশেষ প্রতিনিধি->>

ফেনীর করোনা পরিস্থিতির ‘অবনতি’ হচ্ছে। হাসপাতাল গুলোতে দ্রুত বাড়ছে রোগী। প্রতিনিয়ত বাড়ছে অক্সিজেনের চাহিদা। চলতি জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে (৭ জুলাই পর্যন্ত) মোট ১ হাজার ২৩০টি নমুনা পরীক্ষা করে ৫৫২ জনের করোনা শনাক্ত করা হয়েছে। এই সময়ে নমুনা অনুপাতে শনাক্তের হার প্রায় ৪৫ শতাংশ। গত ৭ দিনে করোনা আক্রান্ত হয়ে জেলায় ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর সংখ্যাও তুলনামূলক হারে বেড়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার জেলায় ২১৯টি নুমনা পরীক্ষা করে ১২৬ জনের করোনা শনাক্ত করা হয়েছে, যা এ যাবত কালের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত জুন মাসে ফেনীর ৩ হাজার ৪৯৯টি নমুনা পরীক্ষায় মোট ৭৩৫ জনের করোনা শনাক্ত করা হয়েছে। নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ছিল প্রায় ২১ শতাংশ। শনাক্তের হার বাড়ার পাশাপাশি ফেনীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে কয়েকগুণ বেড়েছে রোগীর চাপ। চিকিৎসাধীন রোগীদের বেশিরভাগেরই অক্সিজেন প্রয়োজন হচ্ছে।

ফেনীর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল খায়ের মিয়াজী জানান, হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ৩০ শয্যার বিপরীতে বুধবার পর্যন্ত ভর্তি আছেন ১১১ রোগী, যাদের মধ্যে ৩৮ জন করোনা পজিটিভ। এদের মধ্যে ৮২ জনকে অক্সিজেন দেয়া হচ্ছে। আর আইসিইউতে রয়েছেন ১০ জন।

ফেনী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া জানান, হাসপাতালে ৪শ বেডসাইড ও ১শ মেনিফোল্ড অক্সিজেন সিলিন্ডার রয়েছে। রোগীর চাপ বাড়ার কারণে চাহিদা মোতাবেক অক্সিজেন সরবরাহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। চাপ আরও বাড়লে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যেতে পারে। তবে হাসপাতালের লিক্যুইড অক্সিজেন প্ল্যান্ট চালু হলে এ সংকট থাকবে না বলেও তিনি জানান।

ছাগলনাইয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শিহাব উদ্দিন রানা জানান, গত ২৪ ঘন্টায় ছাগলনাইয়ার ২৫ টি নমুনা পরীক্ষা করে ২১ জনের করোনা শনাক্ত করা হয়েছে। শনাক্তের হার ৮৪ শতাংশ। হাসপাতালে ১০ বেডের কভিড আইসোলেশান ওয়ার্ডের বিপরীতে ২৮ জন রোগীকে সেবা দেয়া হচ্ছে। এদের মধ্যে ১০ জন পজিটিভ রোগী, যাদের প্রত্যেকের অক্সিজেন লাগছে।

দাগনভূঞা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. মোহাম্মদ জুলফিকার হাসান জানান, হাসপাতালের করোনা ইউনিটে বর্তমানে ১৬ জন রোগী ভর্তি আছেন। কারো শরীরের অক্সিজেনের মাত্রা ৮৩ শতাংশ, কারো ৮৮ আবার কারো ৯০ শতাংশ। তাদের প্রত্যেকের অক্সিজেন লাগছে। আমাদের যে সক্ষমতা তাতে একদিন পর পরই কুমিল্লা-চট্টগ্রাম পাঠিয়ে অক্সিজেন সিলিন্ডার রিফিল করে এনেও কুলাতে পারছি না।

পরশুরাম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবদুল খালেক জানান, গত ২৪ ঘন্টায় পরশুরামের ৪২ টি নমুনা পরীক্ষা করে ২০ জনের করোনা শনাক্ত করা হয়েছে। শনাক্তের হার ৪৭.৬১ শতাংশ। চারজন রোগী হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আছেন।

এদিকে ফেনীতে দ্রুতগতিতে অক্সিজেনের চাহিদা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যবসায়ী রানা ট্রেডার্সের মালিক রানা। তিনি জানান, গত বছর করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের শুরুতে মানুষ অতি উচ্চ মূল্যে অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনলেও রিফিল হয়েছে কম। কিন্তু চলতি বছর রিফিল বোতলের চাহিদা গত বছরের চেয়ে তিনগুণ বেড়েছে। এভাবে চাহিদা বাড়তে থাকলে অক্সিজেন সংকট দেখা দিতে পারে।

রানা আরও জানান, অক্সিজেন রিফিল করতে সিলিন্ডার ঢাকায় পাঠানো হলেও সময় মত পাওয়া যাচ্ছে না। সারাদেশ হতে সেখানে অক্সিজেন রিফিল করতে সিলিন্ডার যাচ্ছে। ফলে রিফিল করতেও সময় লাগছে। এতে ২শ খালি সিলিন্ডার পাঠালেও বিভিন্ন হাসপাতালের চাহিদা মেটাতে বারবার পরিবহন ব্যয় মেটাতে হচ্ছে। যে কারণে লাভের পরিবর্তে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

ফেনী শহরে তিনটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অক্সিজেন এর পরিবেশক হিসেবে কাজ করছে। অপর দুটি পরিবেশক হচ্ছে তুহিন এন্টারপ্রাইজ ও পপুলার ইঞ্জিনিয়ারিং। তাদের তথ্যমতে, ফেনীতে চলমান করোনা পরিস্থিতিতে প্রতিদিন আড়াইশো বেডসাইড অক্সিজেন সিলিন্ডার চাহিদা রয়েছে।

সিভিল সার্জন ডা. রফিক উস সালেহীন জানান, বুধবার পর্যন্ত ফেনীতে ৫ হাজার ৯ জনের কোভিড-১৯ শনাক্ত হয়েছে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে জেলায় কর্মরত সিভিল সার্জন ডা. সাজ্জাদ হোসেনসহ এ পর্যন্ত ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলায় ৪ হাজার ৯ জন সুস্থ হয়েছেন। আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যুহার ১ দশমিক ৬১।

Sharing is caring!