বিশেষ প্রতিবেদক->>

বিগত কয়েকটি নির্বাচনের তুলনায় ফেনী পৌরসভা নির্বাচনে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। শনিবার ফেনীতে অনুষ্ঠিতব্য পৌর নির্বাচনের ৪৫টি কেন্দ্রের কমবেশি সকল কেন্দ্রেই দেখা গেছে গণমাধ্যমের কার্ডধারী জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের। সবার গলায় ঝুলানো সাংবাদিকতার পর্যবেক্ষণ কার্ড গুলোতে ছিল দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকার নাম। গণমাধ্যমের এমন কার্ডধারী আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থকদের বিরুদ্ধে কেন্দ্র দখলের অভিযোগ করেছে বিএনপির মনোনীত মেয়র প্রার্থী আলাল উদ্দিন আলাল। এ নিয়ে কর্মরত পেশাদার সাংবাদিকদের মাঝেও ক্ষোভ-অসন্তোষ বিরাজ করছে।

বিভিন্ন কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত পৌরসভার ১৮টি ওয়ার্ডের ৪৫টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। ভোটগ্রহণ চলাকালে ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের চাইল্ড হ্যাভেন প্রি-কিন্ডারগার্টেন কেন্দ্রে দলের দায়িত্বরত অবস্থায় সাংবাদিকদের দেখে সরে পড়েন সদর উপজেলার ফরহাদনগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি ফোরকান চৌধুরী। তার গলায় দৈনিক বাংলা নামে একটি পত্রিকার কার্ড ঝুলতে দেখা গেছে। পৌরসভার ১০নং ওয়ার্ডের গালস স্কুল কেন্দ্রে দায়িত্বরত অবস্থায় ছিলেন ফাজিলপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুজিবুল হক রিপন, ৭নং ওয়ার্ড জি এ একাডেমী স্কুল কেন্দ্রে ছিলেন কাজিরবাগ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী বুলবুল আহমেদ সোহাগ।

তাদের মতো সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি করিম উল্যাহ বি.কম, ফুলগাজী উপজেলা সাধারণ সম্পাদক হারুন মজুমদার, পাঁচগাছিয়া ইউনিয়ন সভাপতি মাহবুবুল হক লিটন, সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মানিক, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হানিফ কিরণ, জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাবেদ হায়দার জর্জ, সোনাগাজী উপজেলা সভাপতি আবদুল মোতালেব চৌধুরী রবিন ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মীর এমরান সহ অনেকে সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত পর্যবেক্ষণ কার্ড ব্যবহার করেন।

রাজনৈতিক নেতা ছাড়াও ১০ নং ওয়ার্ড গারস স্কুল কেন্দ্রে দায়িত্বরত সংগঠক ও ব্যবসায়ী আরাফাত খান, ১৮ নং ওয়ার্ডের রামপুর নুরীয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসা কেন্দ্রে দায়িত্বরত ফেনী রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির অফিস সহকারী ও কার্ডিয়াক হাসপাতালের পরিচালক মাঈন উদ্দিন সোহাগ সহ অনেকে সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত পর্যবেক্ষণ কার্ড ব্যবহার করেন।

এদের মধ্যেই বেশিরভাগই স্থানীয় দৈনিক প্রভাত আলো পত্রিকার কার্ড দেখা গেছে। ওই পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক ছাগলনাইয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মেজবাউল হায়দার চৌধুরী সোহেল। দৈনিক প্রভাত আলো ছাড়াও দৈনিক আমাদের ফেনী, জাতীয় দৈনিক দেশ রুপান্তর, স্থানীয় সাপ্তাহিক ফেনীর গৌরব, সাপ্তাহিক স্বদেশ পত্র সহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকার নামে কার্ড দেখা গেছে।

বিএনপির মেয়র প্রার্থী আলাল উদ্দিন আলাল অভিযোগ করেছেন, কেন্দ্র দখলকারীদের মধ্যে যারা নেতৃস্থানীয় ছিল তারা পত্রিকার কার্ড গলায় ঝুলিয়ে রাখতে দেখা গেছে। এ কার্ড ব্যবহার করে সাংবাদিকতাকে কলুষিত করেছে। এদের মধ্যে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্তত ৬০-৬৫ জনের গলায় এ কার্ড ঝুলতে দেখা গেছে। তারা সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কেন্দ্র দখল করেছে। মানুষের আস্থার জায়গা সাংবাদিকতাকেও অপমান-অপদস্ত করেছে।

জানা গেছে, ভোটগ্রহণ চলাকালে ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে মেহেদী-সাঈদী বিদ্যানিকেতন কেন্দ্রে দৈনিক জনতার কার্ড ঝুলিয়ে ঘোরার সময় এক ব্যক্তিকে দেখে ঝাপটে ধরেন দৈনিক জনতার ফেনী প্রতিনিধি মফিজুর রহমান। তিনি জানান, একপর্যায়ে সাংবাদিকদের আক্রোশের মুখে বীমা কোম্পানির ওই কর্মচারী দৌঁড়ে পালিয়ে যান।

এ ব্যাপারে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা নাছির উদ্দিন পাটওয়ারী জানান, দুইশতাধিক সাংবাদিক পর্যবেক্ষণ কার্ড নিয়েছেন। সাংবাদিকদের মধ্যে একাধিক গ্রুপ থাকায় অনেক অসাংবাদিকও সাংবাদিক পরিচয়ে কার্ড সংগ্রহ করেছেন বলে তিনি পরে জেনেছেন।

নাম ও পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক ফেনীর এক প্রবীন সাংবাদিক বলেন, তার সাংবাদিকতার জীবনে এমন চিত্র তিনি আর দেখেন নি। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কেন্দ্রে অবস্থান করার মাধ্যমে সাংবাদিক পেশাকে কলুষিত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে সাংবাদিকদের কার্ড ইসু করার ক্ষেত্রে আরো কঠোর হতে হবে।

ফেনী পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ প্রার্থী নৌকা প্রতীকের নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজী ৬৯ হাজার ৩০৯ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষ প্রতীকের আলাল উদ্দিন আলাল পেয়েছেন ১ হাজার ৯৪৯ ভোট। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের কাছে জামানত হারিয়েছে ধানের শীষসহ অপর চার প্রার্থী।

Sharing is caring!