সোনাগাজী প্রতিনিধি->>

হোসনে আরা বেগমের (৬৭) স্বামী মারা যান ২৭ বছর আগে। অনেক দিন ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও একটি বিধবা ভাতার কার্ড করতে পারেননি তিনি। পরে ২০২০ সালে উপজেলা সমাজসেবা অফিসে একটি বয়স্ক ভাতা কার্ডের আবেদন করেন। ২০২১ সালে তা অনুমোদিত হয়। কিন্তু বয়স্ক ভাতার সে টাকা আজও জোটেনি তাঁর। দীর্ঘ ৩১ মাস ধরে ফাতেমা বেগম নামের আরেক নারীর মুঠোফোনে চলে যায় হোসনে আরা বেগমের বয়স্ক ভাতার টাকা। অথচ এ বিষয়ে কিছুই জানেন না সমাজসেবা কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার সদর ইউনিয়নের চর খোয়াজ এলাকার বাসিন্দা হোসনে আরা বেগম। তাঁর স্বামী মৃত শাহ আলম। কয়েক দিন আগে হোসনে আরা বেগম উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন মাহমুদের কাছে আর্থিক সহায়তার জন্য একটি আবেদন করেন। সেখানে তিনি পূর্বের আবেদনের বিষয়গুলো বলেন। চেয়ারম্যান তাঁকে সুপারিশসহ সমাজসেবা কার্যালয়ে পাঠান। সেখান থেকে জানানো হয় হোসনে আরা বেগম ২০২১ সালের মার্চ থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত (নগদ) মুঠোফোনে নিয়মিত বয়স্ক ভাতার টাকা পেয়ে আসছেন। অথচ হোসনে আরা এ বিষয়ে কিছু জানেন না।

স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে ভিক্ষাবৃত্তি করে চলেন হোসনে আরা বেগম। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, বাড়ির অন্য লোকজনের পরামর্শে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের কাছে বিধবা ভাতার জন্য তিনি একটি আবেদন করেছিলেন, কিন্তু সে কার্ড পাননি। অনেক কষ্টের পর শারীরিক অক্ষমতার কারণে ২০২০ সালে তিনি বয়স্ক ভাতার কার্ডের জন্য সরাসরি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে আবেদন নিয়ে যান। ইউএনও তাঁর কথা শুনে একটি কাগজে লিখে দিয়ে তাঁকে সমাজসেবা কার্যালয়ে পাঠান। সমাজসেবা কার্যালয় থেকে তাঁকে পরে যোগাযোগ করতে বলা হয়। এরপর অসুস্থতার কারণে আর যোগাযোগ করতে পারেননি তিনি।

এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হোসনে আরা বেগমের নামে সমাজসেবা বিভাগের বয়স্ক ভাতার কার্ডে যে মুঠোফোন নম্বরটি রয়েছে, তা হোসনে আরার নয়। ওই নম্বরের মালিক উপজেলার মতিগঞ্জ ইউনিয়নের পালগিরি গ্রামের সফর আলী মাঝি বাড়ির ফাতেমা বেগম।

ভাতা গ্রহণের সত্যতা যাচাই করতে ফাতেমা বেগমের মুঠোফোন নম্বরে কল দিলে তিনি বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তাঁর মুঠোফোনে কোনো টাকা আসে না। তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। তবে সমাজসেবা কার্যালয়ের তথ্য বলছে, ফাতেমা বেগমের হাতে থাকা মুঠোফোন নম্বরে ৩১ মাস ধরে হোসনে আরা বেগমের নামে বয়স্ক ভাতার টাকা গেছে।

জানতে চাইলে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা তারেক আহম্মদ বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে ভাতা গ্রহণকারী ব্যক্তিদের মুঠোফোন নম্বরসহ ডেটা এন্ট্রি করা হয়েছে। ইউপি কার্যালয় থেকে পাঠানো তালিকায় হয়তো হোসনে আরা বেগমের মুঠোফোন নম্বর ভুল পাঠানো হয়েছে। এ কারণে একজনের টাকা অন্যজনের কাছে চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে, তবে এ বিষয়ে তাঁদের কিছুই করার নেই।

এটি ইউনিয়ন পরিষদের ভুল নয় বরং সমাজসেবা কার্যালয়ের ভুল উল্লেখ করে উপজেলার মতিগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান মো. রবিউজ্জামান ও সদর ইউপি চেয়ারম্যান উম্মে রুমা বলেন, গত মাসে সরকারিভাবে উপজেলার সব কটি ইউপির সব ধরনের ভাতাভোগী ব্যক্তিদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে যাচাই-বাছাই ও সত্যতা নিশ্চিত করেন সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এরপরও এমন গুরুতর অনিয়ম তাঁদের চোখে ধরা পড়েনি। এর দায়ভার সমাজসেবা কর্মকর্তাদেরই নিতে হবে।

এ বিষয়ে সোনাগাজীর ইউএনও কামরুল হাসান বলেন, আড়াই বছর ধরে একজনের বয়স্ক ভাতার টাকা আরেকজনের মুঠোফোনে চলে যাচ্ছে। কেউই তা জানে না। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। এ ঘটনায় কেউ জড়িত থাকলে অবশ্যই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।