বিশেষ প্রতিনিধি->>

একদিকে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর (বিএসএফ) বাধা, অন্যদিকে নিম্নমানের কাজসহ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতিতে ধীরগতিতে চলছে ফেনীর বিলোনিয়া স্থলবন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন। বলা যায় অনেকটা থমকে আছে উন্নয়নকাজ।

চলতি বছরের ২৯ আগস্ট বিলোনিয়া স্থলবন্দর অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম পরিদর্শন করেন নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোস্তফা কামাল।

বিএসএফের বাধায় বিলোনিয়া স্থলবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য যে স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে তার ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ সীমান্তের দেড়শ গজের ভেতরে রয়েছে। তাই সেখানে বাংলাদেশ কোনো স্থাপনা নির্মাণ অথবা সংস্কার করতে পারবে না।

*৭০ শতাংশ জমিতে কাজ করতে পারছে না
*দ্বিতীয় দফায় মেয়াদ শেষ হলেও কাজ হয়েছে ২০ শতাংশ

অপরদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের টপলাইনের অবকাঠামো উন্নয়ন কাজের বিভিন্ন নিম্নমানের কাজ করার একাধিক অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তারা অভিযোগ করেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের টপলাইনের দায়িত্বে নিয়োজিত আ ন ম ফয়সাল হায়দার নিম্নমানের ইট, সুরকি, বালু দিয়ে কাজ করায় একাধিকবার স্থানীয় নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়েছে। সর্বশেষ নিম্নমানের কাজের অভিযোগে স্থানীয় লোকজন নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়।

এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টপলাইনের স্বত্বাধিকারী আ ন ম ফয়সাল হায়দার জানান, প্রকৌশলীদের পরামর্শ মোতাবেক গুণগত মান ঠিক রেখে নির্মাণকাজ করা হচ্ছে। তারপরও এলাকার লোকজনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকবার ইট-সুরকি পরিবর্তন করা হয়েছে।

নির্মাণকাজে ধীরগতি ও গাফিলতির বিষয় আ ন ম ফয়সাল হায়দার জানান, শ্রমিক সংকট, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে নির্মাণকাজ কিছুটা ধীরগতিতে হচ্ছে বলে তিনি স্বীকার করেন।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ২০০৯ সালের ৪ অক্টোবর দেশের ১৭তম স্থলবন্দর হিসেবে পথচলা শুরু হয় ফেনীর বিলোনিয়া স্থলবন্দরটির। পরশুরাম উপজেলার সীমান্ত এলাকায় স্থাপিত বন্দরটি দেশের একমাত্র রফতানিমুখী বন্দর। ত্রিপুরাসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যে বাংলাদেশের পণ্য রফতানিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে এটি। এ বন্দর দিয়ে ইট, বালু, সিমেন্ট, পাথর, রড, শুঁটকি, চুন ও গার্মেন্টস সামগ্রী রফতানি হয়। তবে একমুখী বাণিজ্যের কারণে বন্দরটি অবকাঠামোগত উন্নয়নে অনেক পিছিয়ে পড়ে।

এক পর্যায়ে ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জাসদ নেত্রী শিরিন আক্তারের প্রচেষ্টায় বন্দরটির অবকাঠামোগত উন্নয়নের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পরে বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ৩৮ কোটি ৬৪ লাখ ৩৪ হাজার টাকা ব্যয়ে ‘বিলোনিয়া স্থলবন্দর উন্নয়ন (বিশেষ সংশোধিত)’ প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়। ২০১৮ সালের ২০ এপ্রিল বন্দরের আশপাশের ১০ একর জায়গায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ বন্দর কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রকল্পটির কাজ পায় ‘পিবিএল টপ লাইন জিবি’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২২ সালের জুনে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

কাজ শুরুর তিন বছর শেষ হলেও প্রকল্পটির কাজ মাত্র ২০ শতাংশ শেষ হয়েছে। বর্তমানে বিএসএফের বাধার মুখে বাকি কাজ করতে পারছে না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। দ্বিপাক্ষিক উচ্চপদস্থ সিদ্ধান্ত না হলে বাকি কাজ শেষ করা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

ওই প্রকল্পের আওতায় ওয়্যার হাউজ, অভ্যন্তরীণ রাস্তা, ওপেন ইয়ার্ড, পার্কিং ইয়ার্ড, ট্রান্সশিপমেন্ট শেড, অফিস ভবন, ব্যারাক, ডরমেটরি, ড্রেন, টয়লেট কমপ্লেক্স, ওয়েব্রিজ স্কেল, পানি সরবরাহ, বৈদ্যুতিককরণ, ওয়াচ টাওয়ার, ফায়ার ফাইটিল স্থাপন কাজ হওয়ার কথা ছিল।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পিবিএল টপ লাইন জিবি’র কর্ণধার ফয়সাল হায়দার জানান, প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকার জায়গা বিভিন্ন সময়ে মাপা হয়েছেন। সেই হিসাবে প্রকল্পের আওতায় অন্তত ৭০ শতাংশ জায়গা সীমান্তের দেড়শ গজের ভেতরে রয়েছে। এখন ওই জায়গায় কিছু নির্মাণ তো পরের কথা; নির্মাণ সামগ্রীও রাখতে দিচ্ছে না বিএসএফ। বিষয়টি নিয়ে বিজিবি-বিএসএফ কয়েক দফা বৈঠকে বসলেও ফল পাওয়া যায়নি। কাজ দীর্ঘায়িত হওয়ায় একদিকে নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়ছে, অন্যদিকে প্রকল্প শেষ হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তাও বাড়ছে।

জানা যায়, ১৯৭৪ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি মোতাবেক দুই দেশই দেড়শ গজের ভেতরে কাজ করার সম্মতি রয়েছে। এছাড়া ২০১৭ সালের ৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকালে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের এক সমঝোতা চুক্তিতে ফেনীর বিলোনিয়া স্থলবন্দরসহ ১০টি বন্দরের উন্নয়নকাজের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সীমানার ১৫০ গজের ভেতর কাজ করার সম্মতি রয়েছে। কিন্তু সেটাও মানছে না বিএসএফ।

বিজিবি ও বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্র জানায়, বিএসএফের বাধার পর বন্দরের অবকাঠামো নির্মাণকাজের সম্মতি গ্রহণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ২০২০ সালের ১৬ জানুয়ারি নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়। ওই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে একই বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগে একটি প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়। এর আলোকে চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিজিবির মহাপরিচালকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়। জিরো পয়েন্টের ১৫০ গজের ভেতর উন্নয়ন অবকাঠামো নির্মাণের সম্মতি গ্রহণ করতে এরই মধ্যে বিএসএফের সঙ্গে বৈঠকের জন্য বিজিবির পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ভারতের আচরণে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা জানান, ভারত নিজে চুক্তি না মানলেও আন্তর্জাতিক সীমানার দোহাই দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশের কাজ। নো ম্যান্স ল্যান্ড থেকে পাঁচ গজের ভেতর ভারতের সীমানা সড়ক এবং ১৫০ গজের মধ্যে তাদের অনেক স্থাপনা ও বাসা-বাড়ি থাকলেও তারা বাংলাদেশকে বাধা দিচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে বিরোধ শিগগির সমাধানে উভয়পক্ষ এগিয়ে আসবে এমনই প্রত্যাশা তাদের।

বিলোনিয়া স্থলবন্দর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. ইব্রাহিম ভূঁইয়া জানান, এর আগে বন্দরের নানা সমস্যা নিয়ে বিজিবি-বিএসএফ একাধিক বৈঠক হলেও কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। প্রকল্পের কাজ যথাসময়ে শেষ করতে না পারায় আমদানি রপ্তানিকারকদের সমস্যা দেখা দিয়েছে।

প্রকল্পের কাজে নিয়োজিত বন্দর কর্তৃপক্ষের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সাহাব উদ্দিন জানান, বর্তমানে প্রকল্পের বাউন্ডারি ওয়াল, কিছু রাস্তা ও ইয়ার্ড নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্পের অগ্রগতি ২০-২৫ শতাংশের বেশি নয়। বাকি কাজ বিএসএফের বাধার কারণে করা যাচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে বিজিবি-বিএসএফের উচ্চ পর্যায়ে বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওই বৈঠকের ওপর নির্ভর করছে প্রকল্পের বাকি অংশের অগ্রগতি।