বিশেষ প্রতিবেদক->>

দাগনভূঞায় জৈব সার তৈরি করে স্বাবলম্বী হয়েছেন সাইফুল ইসলাম শাহেদ। চাকরির পেছনে না ছুটে জৈব সার তৈরি করা সাইফুল এখন একটি জৈব সার কারখানার মালিক। তিনি নিজের প্রত্যন্ত গ্রামে গড়ে তুলেছেন এম.আর.সি এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিডেট নামের এই জৈব সার কারখানা।

ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের বাতশিরি গ্রামে ২০০৯ সালে সাইফুল জৈব সার তৈরি শুরু করেন। পরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামার বাড়ি থেকে ২০১৬ সালে রেজিস্ট্রেশন পান। এখন সাইফুল দাগনভূঞা উপজেলার একজন আদর্শ কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত। তিনি দীর্ঘদিন ধরে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার ও সম্প্রসারণে কাজ করে আসছেন।

২০২১ সালে সাইফুল গোবর, মুরগির বিষ্টা-লিটার, ফেলনা চা-পাতা ও ট্রাইকোডার্মা ব্যবহারের মাধ্যমে তৈরি এম.আর.সি জৈব সার উৎপাদান করেন প্রায় ২১০ মেট্রিক টন। প্রতি কেজি পাইকারি হিসেবে ১০ টাকা করে বিক্রি করেছেন। ২০২১ সালে মোট ২১ লাখ টাকা জৈব সার বিক্রি করেন উদ্যোক্তা সাইফুল। এছাড়াও তিনি তার উৎপাদিত জৈব সার ব্যবহারের মাধ্যমে প্রায় ৫০ শতাংশ জমিতে সবজি বাগান (টমেটো, লাউ, কুমড়া, বেগুন ও লেটুস) এবং প্রায় ৫০ শতাংশ জমিতে ফল বাগান (লেবু, আম) চাষ করেন।

দাগনভূঞায় সাড়া ফেলে সবজি ও ফল বাগান হতে আয় করেন প্রায় ৮০ হাজার টাকা। ট্রাইকোডার্মা বছরে মিশ্রিত কম্পোস্ট থেকে নিয়মিত জৈব সার উৎপাদন ও সরবরাহ করছেন। এই সার এখন ফেনী, নোয়াখালী, পার্বত্য চট্টগ্রাম, শেরপুর, জামালপুর, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে, রয়েছে ভালো চাহিদা।

জানতে চাইলে উদ্যোক্তা সাইফুল বলেন, সরকারি-বেসরকারিভাবে যদি কৃষকদের জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহিত করে, সার ব্যবসায়ীদের জৈব সার বিক্রির জন্য রাসায়নিক সারের পাশাপাশি জৈব সারের পরিমাণ নির্ধারণ করে দেয় এবং জৈব সারের মূল্য নির্ধারণ করে দেয় তাহলে কৃষক এই সার ব্যবহারে উৎসাহিত হবেন।

তখন সার ব্যবসায়ীরা এই সার বিক্রি করবে। জৈব সার প্রতি শতকে সবজির জন্যে ৫ কেজি, পেঁয়াজ, আলু, ধান, গম, পাটসহ অন্যান্য ফসলের জন্য ৩ থেকে ৪ কেজি, মাছে বিঘা প্রতি ৪০ থেকে ৬০ কেজি, ফল গাছে ৫ থেকে ৭ কেজি করে ব্যবহার করা যায়। আমি ২০০৯ সাল থেকে শুরু করি। ২০১৬ সালে সরকারি লাইসেন্স পাই। ১৬০ শতক জায়গার মধ্যে আমার এই এম.আর.সি এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ।

এই জৈব সার কেজি দশ টাকা করে বিক্রি করছি। প্রতি বস্তার দাম ৪০০ টাকা। ডেইরি ফার্ম থেকে গরুর গবর ক্রয়, মুরগির ফার্ম থেকে বিষ্টা-লিটার ক্রয় ও লেবার এবং পরিবহনসহ কেজি প্রতি সাড়ে ছয় টাকা খরচ হয়। বিক্রি করছি কেজি প্রতি ১০ টাকা। দাগনভূঞা উপজেলা কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা প্রায় সময় পরিদর্শনে আসেন। কোনো রকম সমস্যা হলে কৃষি অফিসের পরামর্শ নিচ্ছি। আমার এখানে ১৪ জন শ্রমিক কাজ করে। আমি রাজশাহী, টেকনাফ, চকরিয়াসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ট্রেনিং নিয়েছি।

জানা গেছে, উদ্যোক্তা সাইফুল ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার-১৪২৮’ এর জন্য উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে মনোনীত হয়েছেন।

কয়েক বছরের ব্যবধানে উদ্যোক্তা সাইফুলের জৈব সার কারখানাতে ১৪ জন শ্রমিক কর্মচারীর কর্মসংস্থান হয়েছে। এখানে কাজ করে তারা তাদের জীবিকা নির্বাহ করছেন। এসব শ্রমিকদের ভেতরে ১০ জন পুরুষ ও ৪ জন নারী শ্রমিক রয়েছে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, জৈব সার উৎপাদনে অন্যান্য যে কাঁচামাল এর মধ্যে ট্রাইকো কম্পোস্টের জন্য ট্রাইকো ডার্মা পাউডার, গোবর, প্রেস মাড আখের গাদ, কলাগাছ, কচুরিপানা, ছাই, খৈই চিটাগুড়, কাঠের গুঁড়া, সবজির উচ্ছিষ্ট, ডিমের খোসা, নিম খৈল, হাড়ের গুঁড়া, শিং কুচি, গাছের পাতা পচা, ব্যবহৃত চা পাতাসহ ইত্যাদি কাঁচামাল প্রয়োজন। এগুলো একত্র করে পর্যায়ক্রমে সেডে পচন ক্রিয়ার মাধ্যমে ৪৫-৫৫ দিনের মধ্যে উৎকৃষ্টমানের জৈব সার বানানো হয়।

উপজেলা কৃষি অফিস ও কৃষকরা জানান, এমন জৈব সারের রয়েছে নানান উপকারিতা। ফলন বৃদ্ধি ও গুণগত মান বাড়ায়, সব ঋতুতে সকল ফসলে ব্যবহার করা যায়, জৈব সার বীজের অংকুরোদগমে সহায়তা করে, মাটির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, মাটির গঠন ও প্রকৃত গুণ রক্ষা করে, মাটির উপকারী জীবাণুগুলোর বংশবৃদ্ধি ও কার্যকারিতা বাড়ায়, মাটিতে রস মজুদ রাখতে সহায়তা করে, ফলে বেশি সেচের প্রয়োজন হয় না। জৈব সার ব্যবহারের ফলে আনুপাতিক হারে রাসায়নিক সারের মাত্রা কমানো যায়, মাটির ভেতরে বাতাস চলাচলে সাহায্য করে, ফসলের সকল প্রকার খাদ্য যোগান দেয়।

এই সার মাটিতে দেওয়ার পর ৬ থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত প্রভাব থাকে যা পরবর্তী ফসলের জন্যেও কাজে লাগে। এসবের বিপরীতে কৃষি জমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহারে রয়েছে নানাবিধ ক্ষতি। রাসায়নিক সারে মাটির জৈব শক্তি দিনকে দিন কমে যায়, ফলে কৃষকরা রাসায়নিক সার বেশি ব্যবহার করলেও তাতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। রাসায়নিক সারে যে ফসল উৎপাদন করা হয় তা মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

এই সার আমদানি নির্ভর ও ফসলের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়, সেচ খরচ বৃদ্ধি পায়। রাসায়নিক সারের দাম বেশি, মানুষের স্বাস্থ্যগত ক্ষতি ও ঝুঁকি বেশি, পরিবেশেও হারায় ভারসাম্য এমনটি জানান কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের উদ্যোক্তা সাইফুলের জৈব সার স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন।

স্থানীয় কৃষক এবং স্থানীয় বাজারের কয়েকজন সার ব্যবসায়ী বলেন, তারা নিয়মিত উদ্যোক্তা সাইফুলের এম.আর.সি এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড থেকে সার কিনে বিক্রি করছেন। সার ব্যবসায়ীরা আরও জানান, কম মূল্যে পরিবেশ বান্ধব এবং নিরাপদ জৈব সার পেয়ে অনেক কৃষক উপকৃত হচ্ছেন। তাছাড়া জৈব সার উৎপাদন এবং সরবরাহের ক্ষেত্রে যে আইনগত প্রক্রিয়া রয়েছে ক্ষেত্র বিশেষ তা শিথিলের দাবি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের।

ট্রেড লাইসেন্স, ফায়ার লাইসেন্স, বিসিক লাইসেন্স, পরিবেশ অধিদপ্তরের লাইসেন্স, সার সমিতির লাইসেন্স এবং খামার বাড়ির লাইসেন্স। একজন কৃষক বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা যদি এসব লাইসেন্স বা প্রক্রিয়ার কথা শোনে তাহলে এমনিতেই সে কাজ শুরু করবে না। ভয়ে পিছিয়ে যাবে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে শর্ত শিথিল করে কৃষি অফিসের তদারকিতে জৈব সার উৎপাদন ও সার সরবরাহের ব্যবস্থা করলে নির্ভরতা কমতে পারে রাসায়নিক সারের উপর।

দাগনভূঞা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মহিউদ্দিন মজুমদার জৈব সারের উৎপাদন, ব্যবহার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রসঙ্গে জানান, রাজাপুরের প্রত্যন্ত গ্রামে এম.আর.সি এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ গড়ে উঠেছে তা আমাদের জন্য সুখবর। কৃষকদের জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে, ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে জৈবসার ক্রয় করা হচ্ছে। অন্যদিকে উদ্যোক্তা সাইফুলকে সবধরনের টেকনিক্যাল সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, গ্রামীণ পরিবেশ হতে উঠে আসা একজন সফল কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি এ এলাকায় পরিচিতি লাভ করেছেন। যে গোবর, মুরগির বিষ্টা-লিটার, ফেলনা চা-পাতা, পঁচা লতা-পাতা ব্যবহার না করে মানুষ তা ফেলে দিত, আজ তিনি সেসব দ্রব্যকে কৌশলে মিশ্রণ করে এম.আর.সি জৈব সার তৈরি করেন এবং একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে এলাকার অন্যান্য কৃষক-যুবকদের মাঝে জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন। এর মাধ্যমে এলাকায় নতুন কৃষি উদ্যোক্তা সৃষ্টি হচ্ছে এবং তরুণ শিক্ষিত বেকার যুবকরা কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য এগিয়ে আসছেন। ফলে এ এলাকার কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণে নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষিত বেকার যুবকরা কৃষিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কৃষি উদ্যোক্তা সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে বেকারত্ব দূর হচ্ছে এবং এই এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থা উন্নত হচ্ছে।

উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা লুৎফুল হায়দার ভূঁইয়া বলেন, এম.আর.সি জৈব সারে ট্রাইকোডার্মা মিশ্রণ করার ফলে এর গুণগতমান বৃদ্ধি হওয়ায় কৃষকরা এর সার ব্যবহার করলে ফসলের ছত্রাকজনিত সমস্যা হতে ফসলকে অনেকাংশে জৈব সারের মাধ্যমেই সমাধান করার সুযোগ আছে।