বিশেষ প্রতিনিধি->>

ফেনীর আলোচিত উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হক একরাম হত্যার সাত বছর (২০ মে) অতিবাহিত হলেও এখনও গ্রেপ্তার হয়নি ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত পলাতক ১৬ আসামী। ২০১৪ সালের এই দিনে দুর্বৃত্তরা একরাম চেয়ারম্যানকে ফেনী শহরের একাডেমী এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে, গুলি করে ও তার ব্যবহৃত পাজারো গাড়ীতে আগুন ধরিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। একরাম হত্যার চার বছর পর ২০১৮ সালের ১৩ মার্চ দেশের ইতিহাসে সর্ব্বোচ্য ৩৯ আসামীকে ফাঁসির আদেশ প্রদান করে বিচারক। ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত ২২ আসামী বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি থাকলেও দন্ডপ্রাপ্ত অপর ১৬ আসামী দীর্ঘ ৮ বছরেও গ্রেপ্তার হয়নি। অপরদিকে নৃশংস হত্যাকান্ডের বিচার নিম্ম আদালতে হলেও উচ্চ আদালতে আপিলে ঝুলে আছে দন্ড কার্যকর।

রায়ের নথি ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত পলাতক যে ১৬ আসামী এখনও গ্রেপ্তার হয়নি তারা হলো-ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের ততকালীন যগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিদ হোসেন জিহাদ, ফেনী-২ আসনের সাংসদ নিজাম উদ্দিন হাজারির মামাতো ভাই আবিদুল ইসলাম আবিদ, চৌধুরী মো. নাফিজ উদ্দিন অনিক, আরমান হোসেন কাউসার, জাহেদুল হাসেম সৈকত, জসিম উদ্দিন নয়ন, এমরান হোসেন রাসেল ওরফে ইঞ্জিনিয়ার রাসেল, রাহাত মো. এরফান ওরফে আজাদ, একরাম হোসেন ওরফে আকরাম, শফিকুর রহমান ওরফে ময়না, কফিল উদ্দিন মাহমুদ আবির, মোসলে উদ্দিন আসিফ, ইসমাইল হোসেন ছুট্টু, মহিউদ্দিন আনিছ, বাবলু, টিটু। এদের মধ্যে আটজন জামিনে মুক্ত হয়ে পলাতক ও চার্জশিটভুক্ত নয়জন শুরু থেকে পলাতক রয়েছে। জামিনে পেয়ে পলাতক আসামীদের মধ্যে হত্যাকান্ডে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত (আদালতে প্রমানিত) আসামী জাহিদ হোসেন জিহাদ ও আবিদুল ইসলাম আবিদসহ কয়েকজন দেশের বাইরে পালিয়ে যায় বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকার দলীয় রাজনৈতিক একাধিক নেতা নিশ্চিত করেছেন।

অপরদিকে ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত কারাবন্দি ২৩ জন আসামী গাজিপুরের কাশিমপুর কারাগারসহ দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তারা হলো- হত্যার পরিকল্পনাকারী জেলা আওয়ামী লীগের ততকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির আদেল, ফেনী পৌরসভার ততকালীন কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল্লাহ হিল মাহমুদ শিবলু, সাজ্জাদুল ইসলাম পাটোয়ারী ওরফে সিফাত, আবু বক্কার সিদ্দিক ওরফে বক্কর, মো. আজমির হোসেন রায়হান, মো. শাহজালাল উদ্দিন শিপন, জাহিদুল ইসলাম জাহিদ ওরফে আজাদ, কাজী শানান মাহমুদ, মীর হোসেন আরিফ ওরফে নাতি আরিফ, আরিফ ওরফে পাঙ্কু আরিফ, রাশেদুল ইসলাম রাজু, মো. সোহান চৌধুরী, জসিম উদ্দিন নয়ন, নিজাম উদ্দিন আবু, আবদুল কাইউম, নুরউদ্দিন মিয়া, তোতা মানিক, মো. সজিব, মামুন, রুবেল, হুমায়ুন, টিপু ও জিয়াউর রহমান বাপ্পি। এদের মধ্যে অনেকটা ‘প্রভাব খাটিয়ে’ জেলা আওয়ামী লীগের ততকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির আদেলসহ কয়েক জন ফেনী জেলা কারাগারে ও ফেনী পৌরসভার ততকালীন কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল্লাহ হিল মাহমুদ শিবলু কুমিল্লা জেলা কারাগারে বন্দি রয়েছে বলে কারাসূত্র নিশ্চিত করেছেন। তবে কারাগারের কোন কর্মকর্তা এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ বদরুল আলম মোল্লা জানান, নিম্ম আদালতে রায় হয়ে যাওয়ার পর মামলাটি উচ্চ আদালতে বিচারধীন রয়েছে। ঘটনার ৭ বছর পর গত বছরের ১৪ নভেম্বর ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামী জিয়াউর রহমান বাপ্পিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পলাতক অপর আসামিদের গ্রেপ্তারের ব্যপারে পুলিশ তৎপর রয়েছে।

ফেনী জজ কোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এ্যাডভোকেট হাফেজ আহম্মদ জানান, ২০১৪ সালের ২০ মে শহরের একাডেমি এলাকায় প্রকাশ্যে একরাম চেয়ারম্যানকে গুলি করে, কুপিয়ে ও গাড়িসহ পুড়িয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় তার বড়ভাই রেজাউল হক জসিম বাদী হয়ে বিএনপি নেতা মাহাতাব উদ্দিন চৌধুরী মিনারের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় ৩০-৩৫ জনকে আসামি করে ফেনী থানায় মামলা করেন। পরে তদন্ত করে ৫৫ জনকে আসামী করে আদালতে চার্জশীট দালিখ করে তদন্ত কর্মকর্তা। মামলার অভিযোগপত্রে পুলিশ ৫৯ জনকে সাক্ষী করলেও আদালত মামলার বাদী, নিহতের স্ত্রী তাসমিন আক্তার, গাড়িচালক আবদুল্লাহ আল মামুনসহ ৫০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন। পুলিশ ও র‌্যাব বিভিন্ন সময়ে ৪৬ জনকে গ্রেপ্তার করে। এদের মধ্যে ১৬ আসামি হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। তদন্ত কর্মকর্তা হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রের মধ্যে দুটি পিস্তল ও কয়েকটি চাপাতি উদ্ধার করে। মামলার দীর্ঘ চার বছর পর ২০১৮ সালের ১৩ মার্চ ততকালীন ফেনী জেলা ও দায়রা জজ আমিনুল হক ওই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ৩৯ আসামিকে মৃত্যুদন্ড ও ১৬ জনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। খালাস পাওয়া ১৬ জনের মধ্যে মামলার প্রধান আসামী বিএনপির নেতা মাহাতাব উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী মিনার ওরফে মিনার চৌধুরী, একরামের একান্ত সহযোগী ততকালীন আওয়ামী লীগ নেতা বেলাল হোসেন পাটোয়ারী ওরফে টুপি বেলাল, যুবলীগ নেতা জিয়াউল আলম মিস্টার অন্যতম।

রায় ঘোষণাকালে আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছিলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচন থেকে আসামিদের সঙ্গে নিহতের দ্ব›েদ্বর সূত্রপাত হয়। রাজনৈতিক দ্ব›েদ্বর কারণে পরিকল্পিতভাবে একজন জনপ্রতিনিধিকে ষড়যন্ত্র করে দিবালোকে হত্যা করা হয়েছে।’

নিম্ন আদালতে রায় ঘোষণার তিন বছর অতিবাহিত হলেও উচ্চ আদালতে আপিলের শুনানী না হওয়ায় রায় কার্যকর নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে স্বজনরা। তবে রায়ের পর থেকে নিহতের স্ত্রীসহ পরিবারের তেমন কোন সদস্য গণমাধ্যমের সাথে রায় নিয়ে কোন ধরনের মন্তব্য করেননি।

আসামীপক্ষের আইনজীবী আহাসান কবীর বেঙ্গল জানান, নি¤œ আদালতে রায় ঘোষণার কয়েক দিন পর উচ্চ আদালতে আপিল করে দন্ডপ্রাপ্ত আসামীরা। তবে আপিল এর উপর এখনও কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

মামলার বাদী ও একরামের বড় ভাই রেজাউল হক জসিম বলেন, রায় ঘোষণা-পরবর্তী আসামিদের আপিল করার পর উচ্চ আদালতে এই মামলার ফাইল নিচে পড়ে যায়। পলাতক আসামিরাও গ্রেপ্তার হয়নি। সে কারণে আমরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।

নিহত একরামের ভাই মোজাম্মেল হক জানান, হত্যাকান্ডটি শুধু দেশে নয়, বিশ্ব মিডিয়াতে ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত হয়েছিল। দোষীরা উপযুক্ত শাস্তি পেলেও পর্দার আড়ালে থেকে গেছে ঘটনার মুল হোতা। তবে ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামীরা যেন উচ্চ আদালত থেকে কোন ভাবে রেহাই না পায় সেদিকে সরকারকে দৃষ্টি দিতে হবে। একই সাথে রায় দ্রæত কার্যকর করতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।

এদিকে একরামের মৃত্যু বাষির্কী উপলক্ষে নিহতের গ্রামের বাড়িতে পরিবারের পক্ষ থেকে দোয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে একরামের মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে এলাকার মসজিদগুলোতে নামাজের পর বিশেষ মোনাজাত করা ছাড়া দলীয় তেমন কোন কর্মসূচী নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল আলিম।