বিশেষ প্রতিবেদক->>

সোনাগাজীর এক বাগানেই দেখা মিলবে অন্তত ৯০ জাতের আম! ফেনী নদী তীরবর্তী মুহুরী সেচ প্রকল্পের এলাকায় সোনাগাজী অ্যাগ্রো কমপ্লেক্সে ৬ হাজার গাছের এই আমের বাগানটি তৈরি করেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর ও স্থানীয় সাহাপুর এলাকার বাসিন্দা মো. সোলায়মান।

৬৫ একরের সমন্বিত খামারে প্রায় ১৫ একর জমিতে তাঁর আমবাগানে রয়েছে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রংপুর, দিনাজপুর, নওগাঁসহ দেশের সব অঞ্চলের আম। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভারত, ভুটান, চীনসহ বিদেশি বাহারি নানা স্বাদের আমও রয়েছে বাগানে।

অবসরপ্রাপ্ত মেজর মো. সোলায়মান জানান, ১৯৮৬ সালে সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে অবসরে যান। এরপর দেশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে আম, মৎস্য চাষ, গবাদিপশু পালন, মধু, সরিষা উৎপাদন ও নার্সারি তৈরির বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরে ১৯৯২ সালে ৩ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে পারিবারিক জমিতে খামার প্রতিষ্ঠা করেন।

তিনি জানান, ১৫ একর জমির মধ্যে ৪ একর জমিতে শুধুই আম বাগান। বাকি আম গাছগুলো লাগানো হয়েছে পুকুরের পাড়ে। চলতি মৌসুমে এ বাগান থেকে ৪০ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে ফলন কম হওয়ায় এখন তা ধরা হয়েছে ২৫ টন।

তিনি আরও জানান, বাগানে ব্যানানা, হিমসাগর, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, ক্ষিরসাপাত, রূপালি, তোলাপুলি, আম্রপালি, হাঁড়িভাঙা, লুবনা, পালমার, ল্যাংড়া, লক্ষ্মণভোগ, মোহনভোগ, ক্ষিরপুলি, শাহী-পছন্দ, রাজভোগ, মির্জাপুরী, কিষাণভোগ, ফজলি, চোষা, আশ্বিনা, অমৃতভোগ, রানী পছন্দ, কৃষ্ণভোগ, দিল পছন্দ, বোম্বাই (মালদা), সূর্যপুরী, মিসরীভোগ, শ্রীধন, গোলাপ খাস, বৃন্দাবনী, দিল খোশ, কোহিতুর, বারমাসী ও কাঁচা মিঠা, কোহিনুর, চৈতালী, জাফরান, দুধ কুমার, দুধসর, বাবুই ঝাঁকি, মধুচাকী, মিঠুয়া, শ্রাবণী, স্বর্ণরেখা, সুবর্ণরেখা, ইত্যাদি জাতের আম রয়েছে।

খামারের মালিক সোলায়মান জানান, সাধারণ জাতের আমগুলো প্রতি কেজি ১শ টাকায় বিক্রি হয়। ব্যানানাসহ কয়েকটি জাতের আম বিক্রি হয় কেজি প্রতি ২শ টাকায়।

তিনি আরও জানান, এসব আম বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে হয় না। খামারে এসেই ক্রেতারা কিনে নিয়ে যান। এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কিছু ক্রেতা রয়েছেন যারা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আম সংগ্রহ করেন। বিকাশে টাকা পাঠিয়ে দেওয়ার পরে ঠিকানায় পৌঁছে যায় অর্ডার করা আম।

স্থানীয়রা বলেন, শুধু আমের মৌসুমে নয়, সারা বছর আম পাওয়া যায় সোলায়মানের বাগানে। প্রতিদিন জেলা শহর ও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে আসেন বাগান দেখেতে এবং আম কিনে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

সম্প্রতি বাগানে গিয়ে দেখা যায় গাছে গাছে ঝুলছে নানা জাতের বাহারী আম। কিছু আমে পাক ধরেছে। কিছু এখনও অপরিপক্ষ, আবার কিছু আম রয়েছে বারোমাসি। গাছে আম ঝুলছে। পুরো খামারটি যেন আমের রাজ্য। আমের ঘ্রাণে মাতোয়ারা চারপাশ।

সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা জানান, বাগানে কীটনাশক বা রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন না। কেবল আমের মুকুল আসার দুই মাস আগে একবার কীটনাশক ছিটানো হয়। আর সারা বছর ব্যবহার করেন জৈব সার। বাগানে স্থায়ী কর্মচারীর সংখ্যা ২৫। আর দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে আছেন আরও ১০ জন। তারাই বাগান পরিচর্যা করেন, ফল তোলেন এবং বিপণন করেন।

খামারে কর্মরত শ্রমিক মাহীব গাজী বলেন, তাঁর বাড়ি বরিশাল। তিনি দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে মেজর সোলায়মানের সঙ্গে আছেন। বাগান ও খামার দেখাশোনা করেন। শ্রমিকদের কাজ বুঝিয়ে দেন।

কৃষি উদ্যোক্তা সোলায়মান জানান, এ খামারটির শুরু করেছিলেন মাত্র ৬ একর জমিতে। বাড়তে বাড়তে এখন সেটি ৬৫ একরের সমন্বিত খামার। খামারের বড় বড় পুকুরে মাছ চাষ হয়। পুকুরের চারপাশে দেশি-বিদেশি জাতের আমগাছ। আছে কাঁঠাল, কলা, পেঁপে, পেয়ারা, নারকেল, ড্রাগন, জামরুলসহ নানা ফলের গাছ। এক পাশে গবাদিপশুর খামার, আরেক পাশে নার্সারি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাজ্জাদ হোসেন মজুমদার বলেন, ফেনীর এই অঞ্চল আমবাগান করার জন্য উপযোগী। খামারি সোলায়মান সোনাগাজীর মাটিতে দেশের বিভিন্ন প্রজাতির আম চাষাবাদ করে সফল হয়েছেন। বাগানটি তিনিসহ কৃষি বিভাগের অন্যরাও পরিদর্শন করেছেন। এ বাগানে উৎপাদিত আমের গুণগত মান ভালো। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ কিনে নিয়ে যায় এ বাগানের আম।