বিশেষ প্রতিবেদক->>

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বেশ কয়েকজন এমপি আলোচিত-সমালোচিত হয়েছিল। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ফেনীর জয়নাল হাজারী। ‘গডফাদার’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো তাকে।

তিনি ছিলেন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী। ফেনী জেলায় তার কথাই ছিল আইন। তার আঙ্গুলি হেলনে চলত ফেনীর রাজনীতি, জীবনযাত্রা। জাতীয় গণমাধ্যমে সংবাদ শিরোনাম হতেন প্রায়ই, যার বেশির ভাগ ছিল নেতিবাচক সংবাদ। ফলে সারা দেশে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন ‘ফেনীর গডফাদার’ নামে। তিনি জয়নাল আবদীন হাজারী।

ফেনীতে তার ‘স্ট্যান্ডিং কমিটি’ ছিল এক বিভীষিকার নাম। এই কমিটির মাধ্যমে তিনি নিয়ন্ত্রণ করতেন পুরো ফেনী শহর। ফেনীতে জয়নাল হাজারী ‘ত্রাসের রাজত্ব’ কায়েম করেছিলেন বলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এমনকি দলের মধ্যে নিজের বিরোধীদের ওপরও খড়গহস্ত ছিলেন হাজারী। তার নির্যাতন থেকে সাংবাদিকরাও রেহাই পাননি। ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হক হত্যাকাণ্ডের পর নানান কারণে আলোচনায় উঠে আসানে হাজারী।

জয়নাল হাজারী ১৯৮৪ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত প্রায় বিশ বছরের বেশি সময় ধরে ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ফেনী-২ (সদর) আসন থেকে ১৯৮৬ সালের তৃতীয়, ১৯৯১ সালের পঞ্চম এবং ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকিটে সংসদ নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সারা দেশে যে কয়জন সংসদ সদস্য নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের জন্য আলোচিত ছিলেন, তাদের অন্যতম ছিলেন জয়নাল হাজারী। এর জবাবে তিনি বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেন, বিএনপি প্রভাবিত ফেনী জেলায় আওয়ামী লীগকে টিকিয়ে রাখার জন্যই লড়াই করতে হয়েছে তাকে।

কিন্তু তার এই ‘লড়াই’ এরপর আর বেশি দিন টেকেনি। ২০০১ সালের ১৭ আগস্ট তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দেশ ছেড়ে পালান জয়নাল হাজারী। ওই দিন গভীর রাতে কারফিউ জারি করে, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ করে তল্লাশি চালানো হয় তার বাড়িতে। কিন্তু তার আগে পালান জয়নাল হাজারী।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে ফিরে আসেন তিনি। এরই মধ্যে পাঁচটি মামলায় ৬০ বছরের সাজা হয় তার। এরপর ওই বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টে আত্মসমর্পণ করলে হাজারী আট সপ্তাহের জামিন পান। পরে ১৫ এপ্রিল নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাকে পাঠানো হয় কারাগারে। প্রায় চার মাস কারাভোগের পরে ২০০৯ সালের ২ সেপ্টেম্বর মুক্ত হন তিনি।

কিন্তু তত দিনে ফেনীর সাম্রাজ্য হাতছাড়া হয়ে যায় জয়নাল হাজারীর। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে দীর্ঘদিন বিদেশে পালিয়ে থাকার সময় ফেনীর রাজনীতিতে তার প্রভাব-প্রতিপত্তি কমে যায় অনেকটা। দীর্ঘদিন পরে দেশে এলেও তা আর পুনরুদ্ধার করতে পারেননি। রাজনীতিতেও তেমন সক্রিয় দেখা যায়নি তাকে। বেশির ভাগ সময় অবস্থান করেন ঢাকায়। এরপর ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ফেনী-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তারই একসময়ের অনুসারী নিজাম উদ্দিন হাজারী।

রাজনীতির মাঠে তার নিষ্ক্রিয়তার কারণ হিসেবে জয়নাল হাজারী গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেন, দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা তাকে ফেনীর রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। তাই তিনি রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন না। ফের যদি দলীয় সভাপতি রাজনীতিতে সক্রিয় হতে বলেন, তাহলে আবার তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন। দল যদি নির্বাচনী কাজে মাঠে নামতে বলে, তিনি মাঠে নামবেন।

হাজারিকা সম্পাদনা ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সব সময়ই সক্রিয় এই রাজনীতিক। প্রতি মাসে কয়েকবার ফেসবুক লাইভে এসে বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে বক্তব্য দেন তিনি। সেখানে ফেনীর রাজনৈতিক, সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা নিয়েও কথা বলেন। আর তার অবসর কাটে লেখালেখি করে, ইন্টারনেট আর ক্রিকেট খেলা দেখে।

এক সময় নেতা কর্মী-ক্যাডার পরিবেষ্টিত হয়ে চলা একসময়ের প্রভাবশালী এই মানুষটি এখন ৪ জন আনসার পাহারায় বাস করছেন বিরলে-নিভৃতে। সঙ্গী নিজের সম্পাদিত দৈনিক পত্রিকা ‘হাজারিকা প্রতিদিন’। আর চার-পাঁচজন সহকারী। থাকেন রাজধানীর ধানমন্ডির এক ফ্ল্যাটে।

সোমবার বিকেল ৫টায় রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। ব্যক্তিজীবনে জয়নাল হাজারী চিরকুমার ছিলেন।

১৯৪৫ সালের ২৪ আগস্ট ফেনী শহরের সহদেবপুর নিবাসী হাবিবুল্লাহ পণ্ডিতের বাড়িতে আব্দুল গণি হাজারী ও রিজিয়া বেগমের সংসারে জন্ম হয় জয়নাল আবেদীন হাজারীর।

Sharing is caring!