বিশেষ প্রতিবেদক->>

বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর প্রথম ওয়ার কোর্সের নবীন সেনা কর্মকর্তাদের পাসিং আউট হয় ৯ অক্টোবর। টানা কয়েক সপ্তাহ প্রশিক্ষণ শেষে পাসিং আউটের মাধ্যমে কমিশন্ড লাভ করেন ওয়ার কোর্সের ক্যাডেটরা। ৬১ জন তরুণ যোদ্ধা এই প্রশিক্ষণ নেন। ভুটান সীমান্তসংলগ্ন মূর্তি শিবিরে ১ জুলাই থেকে দিনরাত ১৪ সপ্তাহের দীর্ঘ প্রশিক্ষণে তৈরি হয় ফার্স্ট বাংলাদেশ ওয়ার কোর্স। সামরিক যুদ্ধের নেতৃত্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই বাহিনীকে সামরিক এবং গেরিলাযুদ্ধের বিভিন্ন শিক্ষায় পারদর্শী করে তৈরি করা হয়।

পাসিং আউট অনুষ্ঠানে ছিলেন বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মুক্তিবাহিনীর প্রধান কর্নেল আতাউল গনি ওসমানী, উপপ্রধান গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। এই তরুণ সেনা কর্মকর্তাদের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। পরে তাঁদের রণনৈপুণ্যে মুক্তিযুদ্ধে গতি আসে।

অনুষ্ঠানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি রণাঙ্গনে মুক্তিবাহিনী সম্মুখসমরের জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি শুরু করেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে হানাদার বাহিনীকে উচ্ছেদ করাই এই প্রস্তুতির লক্ষ্য। শত্রুর জেল থেকে বেরিয়ে এসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান খুব শিগগির ঢাকায় মুক্তিবাহিনীর অভিবাদন গ্রহণ করবেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ব্যর্থ হবে না।

গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা এই দিন অবরুদ্ধ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালান।

১ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা ফেনীর গুতুমা সীমান্তঘাঁটির কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানে অতর্কিতে হামলা করেন। তাঁদের ছোড়া গ্রেনেডে পাকিস্তানি বাহিনীর দুজন হতাহত হয়।

২ নম্বর সেক্টরের একদল মুক্তিযোদ্ধা কুমিল্লার সাদিকপুরে অ্যামবুশ করে পাকিস্তানি বাহিনীর অপেক্ষায় থাকেন। পাকিস্তানি বাহিনীর একটি দল অ্যামবুশের আওতায় এলে তাঁরা আক্রমণ করেন। অতর্কিত এ হামলায় পাকিস্তানি বাহিনীর বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের আরেকটি দল আমানগান্ধা এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীকে অ্যামবুশ করে। এখানে তাঁদের কয়েকজন হতাহত হন। সালদা নদীতেও পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়।

৮ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা দশাতিনায় পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে অতর্কিতে হামলা করলে পাকিস্তানিদের বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়।

বিদেশি শক্তিকে ভারত গ্রাহ্য করবে না
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সিমলার কৈলাসনগরে নিখিল ভারত নব কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে বলেন, বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের কী করা উচিত, সে সম্পর্কে কোনো বিদেশি শক্তির নির্দেশ তাঁরা গ্রাহ্য করবেন না। তিনি জোরের সঙ্গে বলেন, সোভিয়েত-ভারত চুক্তি বাংলাদেশের ঘটনাবলির ব্যাপারে ভারতের ব্যবস্থা নেওয়ার স্বাধীনতায় কোনোক্রমেই হস্তক্ষেপ করেনি। দেশের জাতীয় স্বার্থের কথা মনে রেখে বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারত সিদ্ধান্ত নেবে। ছোট হোক, বড় হোক, সরকার কোনো বিদেশি শক্তিকে ভারতের নীতির ব্যাপারে নাক গলাতে দেবে না।

ইন্দিরা গান্ধী সতর্ক করে বলেন, সীমান্তের দেশ একটি গুরুতর পরিস্থিতির সম্মুখীন। বাংলাদেশের ব্যাপারে সরকার যে পন্থাই নিক না কেন, জনসাধারণকে আর্থিক ও অন্য নানা অসুবিধার সম্মুখীন হতে হবে। এই অসুবিধাগুলো জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি সংগ্রহ করতে হবে।

ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জনজীবন রাম সিমলার কৈলাসনগরে নিখিল ভারত নব কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে বলেন, ভারত যুদ্ধ চায় না। কিন্তু ভারতের আঞ্চলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘনের কোনো অপচেষ্টা হলে ভারত সমুচিত জবাব দিতে বাধ্য হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর ক্রমবর্ধমান সাফল্যে পাকিস্তানি শাসকদের মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে মাঝেমধ্যে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে।

পাকিস্তানের তৎপরতা
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান এই দিন এক ঘোষণায় ৭৬ নম্বর সামরিক বিধি তুলে নিয়ে ৯৪ নম্বর সামরিক বিধি জারি করেন। এ আদেশে পাকিস্তানের সংহতি ও অখণ্ডতা বা আদর্শের পক্ষে ক্ষতিকর প্রচার কার্যক্রমের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে রাজনৈতিক তৎপরতা থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।

ইসলামাবাদে এক সরকারি ঘোষণায় জানানো হয়, পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ এবং প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন এ দিন আবার পিছিয়ে দেওয়া হয়। কারণ, পরবর্তী মাসের আগে শূন্য আসনগুলোর নির্বাচন শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। পাকিস্তান নির্বাচন কমিশন জানায়, পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের ৭৮টি আসন এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের ১০৫টি আসনে মনোনয়ন পেশ করার শেষ দিন ছিল ২০ অক্টোবর। দ্বিতীয় পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তানের ৮৮টি প্রাদেশিক পরিষদের মনোনয়ন পেশ করার শেষ দিন ১ নভেম্বর। আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সদস্যদের সদস্যপদ খারিজ করে ওই সব আসনে উপনির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়।

পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ৮ অক্টোবর মুলতানে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, তাঁর দলে ভাঙন সৃষ্টি করার জন্য প্রেসিডেন্ট সরকারি তহবিল থেকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করছেন। প্রেসিডেন্ট তাঁর দলের ক্ষতি করার জন্য দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে উসকানি দিচ্ছেন। তারা গত ডিসেম্বরের নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিল। পশ্চিম পাকিস্তানে তাঁর দল সংখ্যাগরিষ্ঠ।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর এক, দুই ও আট; ইত্তেফাক, ঢাকা, ১০ অক্টোবর ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ভারত ৯, ১০ ও ১২ অক্টোবর ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান

Sharing is caring!