আদালত প্রতিবেদক->>

ফেনীতে ২৭ কোটি টাকা মূল্যের ছয় লাখ ৮০ হাজার ইয়াবা ও নগদ সাত লাখ টাকাসহ গ্রেপ্তারকৃত পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মাদকের মামলার বিচার কাজ শুরু হয়েছে। বুধবার ফেনী ফেনী জজ আদালতের বিচারক অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ কায়সার মোশারফ ইউছুপ তিনজন ম্যাজিষ্ট্রেটের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন।

আদালত সূত্র জানায়, ফেনী জেলা ও দায়রা জজ ড. বেগম জেবুন্নেসা ছুটিতে থাকায় বুধবার ফেনীর অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ কায়সার মোশারফ ইউছুপ জিআর ৩৯৪/১৫, দায়রা-৪০২/২০ মামলার বিচারকাজ শুরু করেন। প্রথম দিন ওই মামলার পাঁচজন আসামীর আদালতে ফৌজধারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডকারী তিনজন ম্যাজিষ্ট্রেট সাক্ষ্য প্রদান করেন। তাঁরা হলেন-ফেনীর তৎকালীন সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট (বর্তমানে চীপ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট-কক্সবাজার) আলমগীর মুহাম্মদ ফারুকী, ফেনীর তৎকালীন সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট (বর্তমানে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ, সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম) মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন ও ফেনীর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন।

ফেনী জজ আদালতের বেঞ্চ সহকারী আলতাফ হোসেন জানান, ম্যাজিষ্ট্রেটদের সাক্ষ্য প্রদানকালে আসামীগন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া আসামী পক্ষের আইনজীবিগণ জেরা করেন। রাষ্ট্রপক্ষে সহায়তা করেন আদালতের সরকারী কৌসুলী (পিপি) হাফেজ আহম্মদ।

সরকারী কৌসুলী (পিপি) হফেজ আহম্মদ জানায়, ২০১৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর চাঞ্চল্যকর এ মামলায় তৎকালীন ঢাকা মহানগর পুলিশের বিশেষ শাখার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মাহফুজুর রহমান ও আইনজীবীসহ ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সিআইডির কুমিল্লা জোনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জালাল উদ্দিন। ২০২০ সালের ৩ নভেম্বর ফেনী জেলা ও দায়রা জজ ড. বেগম জেবুন্নেসা ১৪ জন আসামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে ১০ ডিসেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেন।

পিপি আরও জানায়, গেল বছরের ১০ ডিসেম্বর মামলার বাদী তৎকালীন র‌্যাব-৭ ফেনী ক্যাম্পের উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) নায়েক সুবেদার মনিরুল ইসলামের সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেন আদালত। নির্ধারিত তারিখে বাদী হাজির না হওয়ায় পরবর্তী তারিখ ৪ জানুয়ারি সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়। ৪ জানুয়ারিও বাদী না আসায় ২৫ জানুয়ারি সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেন আদালত। এদিনও সাক্ষ্য দিতে আদালতে হাজির হন নি তিনি। তবে বুধবার তিনজন ম্যাজিষ্ট্রেটের সাক্ষ্য গ্রহনের মধ্য দিয়ে মামলার বিচার কাজ শুরু হয়েছে।

মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের ২০ জুন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী সদর উপজেলার লালপোল এলাকায় র‌্যাবের একটি দল ২৭ কোটি টাকা মূল্যের ৬ লাখ ৮০ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট, ইয়াবা বিক্রির নগদ ৭ লাখ টাকা, ৪টি মোবাইল ফোন, বিভিন্ন ব্যাংকের ৮টি ক্রেডিট কার্ডসহ কালো রং’র ‘এলিয়ন’ প্রাইভেটকার জব্দ করে। ওই সময় পুলিশের বিশেষ শাখার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মাহফুজুর রহমান ও গাড়ি চালক জাবেদ আলীকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এই ঘটনায় র‌্যাবের পক্ষ থেকে নায়েক সুবেদার মনিরুল ইসলাম বাদী হয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে তিন পুলিশসহ চারজনকে আসামি করে ফেনী মডেল থানায় মামলা করেন।

পরবর্তীতে তদন্তে আর অনেক আসামিকে গ্রেপ্তার করে। মামলার আসামিরা হলেন- এএসআই মাহফুজুর রহমান এবং তার গাড়ি চালক জাবেদ আলী, ঢাকা জজ আদালতের আইনজীবী জাকির হোসেন, কুমিরা হাইওয়ে থানার তৎকালীন এসআই মো. আশিকুর রহমান, গিয়াস উদ্দিন, সালেহ আহম্মদ, আবদুল মোতালেব, কাশেম আলী, শাহীন, মো. শাহিন মিয়া, মো. তোফাজ্জল হোসেন, মো. বিল্লাল হোসেন, ফরিদুল আলম, মো. জাফর, মো. রুবেল সরকার। আসামিদের মধ্যে কয়েকজন পুলিশ সদস্য।

মামলার পর পুলিশি রিমান্ড শেষে ওই বছরের ২৪ জুন এএসআই মাহফুজুর রহমান তৎকালীন ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আলমগীর মুহাম্মদ ফারুকীর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। পুলিশ মামলার তদন্তকালে ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত বিভিন্ন স্থান থেকে নয়জনকে গ্রেপ্তার করে। বাকী ৫ জন পলাতক রয়েছেন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজন ফেনীর আদালতে ফৌজধারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। তারা হলেন-পুলিশের এএসআই মো. মাহফুজুর রহমান, গাড়ী চালক জাবেদ আলী, মো. গিয়াস উদ্দিন, মো. কাশেম আলী ও তোফাজ্জল হোসেন। গ্রেফতারদের মধ্যে ৪ জন উচ্চ আদালত থেকে জামিনে রয়েছেন।

ওই বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ফেনী মডেল থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) মো. শাহিনুজ্জামান আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। আদালত তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে পুনরায় তদন্তের জন্য অপর একজনকে দায়িত্ব দেন। ২০১৬ সালের ২২ মে দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্র জমা দিলে আদালত তাতেও সন্তুষ্ট হয়নি। এক পর্যায়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিকে তদন্তের দায়িত্বভার দেওয়া হলে ২০১৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ওই মামলায় ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। অভিযোগ পত্রে ৩৮ জনকে স্বাক্ষী করেছে তদন্ত কর্মকর্তা।

আলোচিত এ মামলায় আসামিপক্ষের মামলা পরিচালনা করছেন আইনজীবী সাহাব উদ্দিন আহমদ, আনোয়ারুল করিম ফারুক, কামরুল হাসান, শামসুদ্দিন মানিক, মীর মোশাররফ হোসেন মানিক, তাজুল ইসলাম বিপুল প্রমুখ।

তৎকালীন সময়ে র‌্যাবের তথ্য মতে, গ্রেপ্তারের পর এএসআই মাহফুজ র‌্যাবকে জানিয়েছিলেন, ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে কক্সবাজারের টেকনাফে চাকরির সুবাদে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠে তার। তার নোট বই থেকে ১৪ জনের সঙ্গে ২৮ কোটি ৪৪ লাখ ১৩ হাজার টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। কক্সবাজার থেকে আনা ৬ লাখ ৮০ হাজার পিস ইয়াবার চালানটি ঢাকায় পৌঁছে দিতে কক্সবাজার গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের এসআই মো. বেলাল ও চট্টগ্রাম পুলিশের কুমিরা হাইওয়ে ইনচার্জ (আইসি) মো. আশিক তাকে অনুরোধ করেছেন বলে র‌্যাবকে জানিয়েছিলেন গ্রেফতার হওয়া মাহফুজ। ঢাকায় তার কাছ থেকে ইয়াবাগুলো হাইকোর্টের মুহুরী মো. মোতালেব, অ্যাডভোকেট জাকির, এসবি কনস্টেবল শাহীন, কাশেম, গিয়াসদের বুঝে নেওয়ার কথা ছিল।

Sharing is caring!