শহর প্রতিনিধি->>

ফেনীর ঐতিহাসিক জহির রায়হান হল দ্রুত পুননির্মাণ হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। শহীদ জহির রায়হান হল পুননির্মাণ ও রাজাঝির দিঘির সৌন্দর্যবর্ধন এবং আধুনিকায়নের লক্ষ্যে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক জরুরি সভায় এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে।

জেলা প্রশাসক আবু সেলিম মাহমুদ-উল হাসানের সভাপতিত্বে সভায় অতিথি ছিলেন ফেনী-২ আসনের সাংসদ নিজাম উদ্দিন হাজারী। সভায় ফেনী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান খায়রুল বশর মজুমদার তপন, জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী আবু দাউদ মো. গোলাম মোস্তফা, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক ড. মঞ্জুরুল ইসলাম, ফেনী পৌরসভার মেয়র নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজিসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

সভায় সকলের মতামতের ভিত্তিতে সর্বসম্মতিক্রমে শহীদ জহির রায়হান হল পুননির্মাণ এর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। একই সাথে ফেনী রাঝাজির দীঘির পাড়ে অবস্থিত শিশু পার্কের ওয়াল সরিয়ে সৌন্দর্যবর্ধনে গ্রীল নির্মাণ এর সিদ্ধান্ত গৃহীত করা হয়।

সভায় ফেনীর সংস্কৃতিকর্মীদের বহুদিনের দাবি জহির রায়হান হল পুননির্মাণ এবং রাজাঝির দিঘির পাড়ের সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

প্রসঙ্গত, বাংলা চলচ্চিত্রের প্রবাদ পুরুষ ছিলেন শহীদ জহির রায়হান। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, চলচ্চিত্র পরিচালক, ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক, সংগীত পরিচালক ও গল্পকার। গত ১৯ আগস্ট ছিল তার এই কীর্তিপুরুষের ৮৬তম জন্মবার্ষিকী। শহীদ জহির রায়হানের নামে প্রতিষ্ঠিত মিলনায়তনটি ‘ওয়ান-ইলেভেন’ সরকারের আমলে আধুনিকভাবে পুননির্মানের জন্য ভেঙে ফেলা হলেও এখনো পুননির্মাণ হয়নি তার নামের হলটি।

১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট তৎকালীন ফেনী মহকুমার, বর্তমানে ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জহির রায়হান। তার ছোট ভাই সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা ও শহীদ জহির রায়হান স্মৃতি পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা মো. সফিউল্লাহ জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি মজুপুরে জন্মদিনে মিলাদ ও দোয়ার আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া সংস্কৃতিপ্রেমীরা এদিন জহির রায়হান স্মৃতি পাঠাগারে এসে জড়ো হন এবং তার স্মৃতিচারণ করেন। এ বছর করোনার কারণে বুধবার আছর নামাজের পর দোয়ার আয়োজন করেন তারা।

১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন জহির রায়হান। তার সাহিত্যিক ও সাংবাদিক জীবন শুরু হয় ১৯৫০ সালে যুগের আলো পত্রিকায়। পরবর্তীতে তিনি খাপছাড়া, যান্ত্রিক, সিনেমা ইত্যাদি পত্রিকাতেও কাজ করেছেন। ১৯৫৬ সালে তিনি সম্পাদক হিসেবে প্রবাহ পত্রিকায় যোগ দেন।

১৯৬১ সালে তিনি পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। অংশ নিয়েছিলেন ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান। সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচার কাজ শুরু করেন। নির্মাণ করেন আলোচিত ‘স্টপ জেনোসাইড’ প্রামাণ্যচিত্র।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী শরণার্থীদের দুঃখ-দুর্দশা, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, ভারতে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের দিনকাল এই প্রামাণ্যচিত্রে তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি করার ক্ষেত্রে তার ‘স্টপ জেনোসাইড’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কলকাতায় তার নির্মিত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেওয়ার বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয় এবং চলচ্চিত্রটি দেখে সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ ভূয়সী প্রশংসা করেন। চরম অর্থনৈতিক দৈন্যের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হতে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করেন।

জহির রায়হান পেয়েছেন ‘নিগার’ চলচ্চিত্র পুরস্কার, আদমজী সাহিত্য পুরস্কার এবং বাংলা একাডেমির মরণোত্তর সাহিত্য পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার। বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য গল্প শাখায় তিনি ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। চলচ্চিত্রে ১৯৭৭ সালে (মরণোত্তর) একুশে পদক এবং সাহিত্যে ১৯৯২ সালে (মরণোত্তর) স্বাধীনতা পুরস্কার পান। ১৯৭৫ সালে ১ম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাকে মরণোত্তর বিশেষ পুরস্কার প্রদান করা হয়। তার প্রথম উপন্যাস ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয়।

তার প্রথম চলচ্চিত্র ‘কখনো আসেনি’ নির্মিত হয় ১৯৬১ সালে। আর ১৯৬৪ সালে ‘কাঁচের দেয়াল’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি নিগার পুরস্কার লাভ করেন। তার নির্মিত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হলো বেহুলা, সঙ্গম, আনোয়ারা এবং জীবন থেকে নেওয়া। স্বাধীনতার পর তার ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে ঢাকার মিরপুরে তিনি নিখোঁজ হন।

এক যুগেও ফেনীর শহীদ জহির রায়হান হল পুননির্মাণ করা হয়নি। ২০০৮ সালে তৎকালীন ‘ওয়ান-ইলেভেন’ আমলে আধুনিকায়নের নামে শহীদ জহির রায়হান হল ভেঙে ফেলা হয়। পরবর্তীতে দরপত্র আহ্বান করেও নকশা ত্রুটির কারণে নির্মাণকাজ আটকে যায়। সাংস্কৃতিক কর্মীরা হলটি পুনর্নির্মাণের জন্য মানববন্ধন-স্মারকলিপিসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছে।

শহীদ জহির রায়হান হলের জন্য নির্ধারিত স্থানটি জেলা পরিষদের আওতাধীন। এ বিষয়ে কথা হয় পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবু দাউদ মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা জানান, হলের পূর্বের জায়গার পরিমাণ ৪৩ শতাংশ। আর প্রস্তাবিত হলের জন্য প্রয়োজন ১০৩ শতাংশ জায়গা। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একাধিকবার নথি চালাচালি হয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে প্রয়োজনীয় জায়গা না পেলে হল নির্মাণ সম্ভব নয়। (সূত্র: প্রতিদিনের সংবাদ)

Sharing is caring!