বিশেষ প্রতিবেদক->>

ফেনীতে ২০টি স্বর্ণবার ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তদন্তে অভিযুক্ত প্রমানিত হওয়ায় চট্টগ্রামের স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও পুলিশের সোর্স ছমদুল হক ভুট্টুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত শনিবার তাকে আটক করে চট্টগ্রাম থেকে ফেনী থানায় আনা হয়। রোববার দুপুরে তাকে ২০টি স্বর্ণবার ডাকাতি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করা হয়। রোববার সন্ধ্যায় স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও পুলিশের সোর্স ছমদুল হক ভুট্টু আদালতে স্বীকারোক্তিকমুলক জবানবন্দি দিয়েছে। পরে তাকে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ফেনী মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মনির হোসেন জানান, গোয়েন্দা পুলিশের স্বর্ণবার ডাকাতির মামলার তদন্তে ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে চট্টগ্রামের স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও পুলিশের সোর্স ছমদুল হক ভুট্টুকে শনিবার রাতে চট্টগ্রাম থেকে আটক করে পুলিশ। রোববার তাকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করা হয়। রোববার সন্ধ্যায় ফেনীর সিনিয়ার জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কামরুল হাসানের আদালতে ছমদুল হক ভুট্টু ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দিয়েছে।

আদালতের একটি সূত্র জানায়, ছমদুল হক ভুট্টু তার স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দিতে বলেছেন-চট্টগ্রামের স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও ২০টি স্বর্ণবার ডাকাতি মামলার বাদি গোপাল কান্তি দাশ এক সময়ে তার ব্যবসায়ীক অংশিদার ছিলো। গোপাল ২৭টি স্বর্ণবার নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যাচ্ছিলেন এমন তথ্যটি তিনি একজনকে জানিয়েছিলেন। যাকে তিনি এ তথ্যটি জানিয়েছিলেন তিনি ফেনী জেলা গেয়েন্দা পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করেন। ওই সোর্স ফেনী জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. সাইফুল ইসলাম ভূইয়াকে জানিয়েদেন স্বর্ণবারগুলো গোপাল চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা নিয়ে যাচ্ছেন। সোর্সের সেই তথ্যে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ অভিযান চালিয়ে স্বর্ণ ব্যবসায়ী গোপাল কান্তি দাশের গাড়ি আটকিয়ে তল্লাশি করে। ডিবি পুলিশ সে সময়ে ১৫টি স্বর্ণবার পেলেও ১২টি স্বর্ণবার লুকায়িত অবস্থায় স্বর্ণ ব্যবসায়ী গোপাল কান্তি দাশের গাড়িতে থেকে যায়। পরে গোপাল কান্তি দাশের চট্টগ্রামে ফিরে তার সাবেক ব্যবসায়ীক অংশিদার ছমদুল হককে বিষয়টি অবগত করে। স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দিতে সে আরও জানিয়েছে, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা নিয়ে যাওয়া বেশিরভাগ স্বর্ণবার কক্সবাজারের টেকনাফ দিয়ে মিয়ানমার হতে চোরাই পথে আনা হয়।

এদিকে ২০টি স্বর্ণের বার ডাকাতি ও লুটের মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেষ্টিগেশনে (পিবিআই)কে তদন্তভার দেওয়ার পর তারা তদন্ত শুরু করেছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক শাহ আলম বলেন, ‘এখন থেকে এই মামলাটি পিবিআই তদন্ত করবে। মামলা সংক্রান্ত সব তথ্য-উপাত্ত আমরা বুঝে নিয়েছি। গ্রেপ্তার ছয় বরখাস্ত পুলিশ কর্মকর্তা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আমাদের হেফাজতে থাকবে।’

অপরদিকে ফেনী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নিজাম উদ্দিন জানান, মামলার তদন্তে সন্ধিগ্ধ এসআই ফিরোজ আলমকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, জেলা গোয়েন্দা পুলিশের বহিস্কৃত পরিদর্শক মো. সাইফুল ইসলাম ভূইয়ার বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া ১৫টি বারের ১০টি মিয়ানমারের ও অপর পাঁচটি বার দুবাই থেকে আনা হয়েছে।বারগুলোর গায়ে স্ব-স্ব দেশের নাম রয়েছে।

মামলার বাদি ব্যবসায়ী গোপাল কান্তি দাশের দাবি, তার সবকটি বার ছিল দুবাই থেকে আমদানি করা।

ফেনীর পুলিশ সুপার খোন্দকার নূরুন্নবী জানান, পুলিশ হেডকোয়ার্টারের নির্দেশনার আলোকে ফেনীতে আলোচিত স্বর্ণ ডাকাতি মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে পিবিআই। ইতোমধ্যে পিবিআই মামলা তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে। মামলার বাদির দেয়া তথ্য অনুযায়ী লুট হওয়া পাঁচটি বারের যেমন হদিস নেই তেমনি উদ্ধার হওয়া ১০টি বারের উৎস খুঁজে দেখবে তদন্তকারী সংস্থা।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, মামলার বাদি ব্যবসায়ী গোপাল কান্তি দাশ গত শনিবার থেকে আত্নগোপনে রয়েছে। ওইদিন তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে যেয়ে পুলিশ তালা বন্ধ পেয়েছে। তার ব্যবহৃত মুঠোফোনেও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না বলে সূত্রটি নিশ্চিত করেছে।

ফেনী আদালত পুলিশের পরিদর্শক গোলাম জিনালী জানান, মামলার প্রধান আসামী জেলা গোয়েন্দা পুলিশের বহিস্কৃত ইন্সপেক্টর (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম ভূইয়ার চার দিনের রিমান্ড শেষে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ফেনী মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মনির হোসেন রোববার তাকে আদালতে হাজির করে। এসময় ফেনীর সিনিয়ার জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কামরুল হাসানের আদালতে দ্বিতীয় দফায় আসামীর সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে। বিচারক কামরুল হাসান আসামী সাইফুলের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। পরে আসামীকে আদালত থেকে পিবিআই পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। এর আগে গত বুধবার থেকে প্রথম দফায় চার দিনের রিমান্ডে ছিলো জেলা গোয়েন্দা পুলিশের বহিস্কৃত ইন্সপেক্টর (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম ভূইয়া।

আদালত পুলিশের পরিদর্শক আরও জানান, মামলার অধিক তদন্তের জন্য মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) স্থানান্তর করা হয়েছে। এর আগে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে মামলাটি পিবিআইতে স্থানান্তরের জন্য আদালতে আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন।

এর আগে শনিবার স্বর্ণবার ডাকাতি মামলার আসামীদের মধ্যে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সদ্য বহিস্কৃত ৫ কর্মকর্তার ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলো আদালত। দ্বিতীয় দফায় তিন দিনের থাকা আসামীরা হলো-জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোতোহের হোসেন, উপ-পরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান, উপ-পরিদর্শক (এসআই) নুরুল হক, সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) অভিজিৎ বড়ুয়া ও সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মাসুদ রানা।

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রামের স্বর্ণ ব্যবসায়ী গোপাল কান্তি দাশ ২০টি স্বর্ণের বার ডাকাতির অভিযোগে গত ১০ আগস্ট মঙ্গলবার অভিযুক্ত ৬ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফেনী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। ওই দিন রাতেই আসামীদের গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলামের বাসা থেকে ১৫টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করে পুলিশ। একই দিন ডিবির অভিযুক্ত ছয় কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বহিস্কার করে জেলা পুলিশ।

Sharing is caring!