বিশেষ প্রতিবেদক->>

‘ফেনীর কবি’ হিসেবে পরিচিত প্রবীণ সাংস্কৃতিক সংগঠক কবি মঞ্জুর তাজিম আক্ষেপ করে বলেছেন, ফেনীতে বিগত এক দশকের বেশি সময় ধরে একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে সপ্তাহ ব্যাপি একুশে গ্রন্থমেলা আয়োজন করে জেলা প্রশাসন। বই মেলাকে কেন্দ্র করে সৃজনশীল চর্চা ও মুক্তবুদ্ধির বিকাশ ঘটে। চলতি বছর বই মেলার আয়োজন বন্ধ কেন? সরকার যদি করোনার অজুহাতে বই মেলার অনুমতি না দিয়ে থাকে তাহলে ওয়াপাদা মাঠে বানিজ্য মেলার অনুমোদন কে দিয়েছে। কিভাবে জানিজ্য মেলার প্রস্তুতি শেষ করে উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকে? কার ইশারায় এসব হচ্ছে? প্রশাসন কি জেগে ঘুমায় না আয়োজনকারীদের থেকে মোটা অংকের অর্থ সুবিধা নেয়?

শুধু কবি মঞ্জুর তাজিম না গত এক সপ্তাহে ফেনীর অনেক সাংস্কৃতিক কর্মী বানিজ্য মেলার আয়োজন দিয়ে ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। একই সাথে ফেনী শহরের বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়ীরা বানিজ্য মেলা বিরোধী মতামত দিয়েছে। তাহলে কিভাবে জেলায় বানিজ্য মেলায় অনুমতি পায় মেলা আয়োজনকারী কর্তৃপক্ষ এমন প্রশ্ন সর্বত্র ঘুরপাক খাচ্ছে।

মহিউদ্দিন খোন্দকার নামে শিক্ষক বলেন, কোভিড-১৯ সংক্রমণরোধে সরকারের সিদ্ধান্তে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছে। কিন্তু মেলাতে সবচেয়ে বেশি ভিড় করে নারী ও শিশু-কিশোর।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, করোনায় স্বাস্থ্যবিধি মানতে ফেনীতে অমর একুশে বইমেলা না হলেও শহরের ওয়াপদা মাঠে প্রতি বছরের মত বাণিজ্য মেলার সকল আয়োজন সম্পন্ন। স্টল গুছিয়ে বিক্রেতারা ক্রেতার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। মেলায় ৮০টি স্টল রয়েছে। মেলাতে আকর্ষণের অন্যান্য পণ্যের মধ্যে রয়েছে গার্মেন্টস সামগ্রী, ব্যাগ ও নিত্য ব্যবহার্য কাঁচের পণ্য।

মেলার পরিচালক ইসলাম খান পিন্টু জানান, উদ্বোধনের তারিখ চুড়ান্ত না হলেও সহসা তারিখ নির্ধারণ হবে। চলবে ত্রিশ দিন। তবে অতীতে মেলা একমাসের অনুমতি নিয়ে শুরু হলেও চলত আরও বেশি দিন।

শহরের বড় বাজারের মদিনা স্টোরের মালিক নুরুল আফসার বলেন, এমনিতেই করোনার কারণে বড় রকম দেনা সৃষ্টি হয়েছে। নতুন উৎপাত যোগ হয়েছে বাণিজ্য মেলা। মেলাগুলোতে অন্যতম আকর্ষণ থাকে কসমেটিকস। ক্রেতা সেখানেই ভিড় করে। সেখানে সবাই ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী এবং নকল ও নিম্নমানের প্রসাধনী কম দামে বিক্রয় করে। কিন্তু কখনো অভিযান পরিচালনার খবর পাই না। তাছাড়া মেলা শেষে ক্রেতা যখন একই মোড়কের পণ্য কিনতে এসে উচ্চমূল্য দেখে, তখন কৈফিয়ত দিয়ে হয়রান হতে হয়।

জেবি সড়কে এলাহী কর্ণারের মালিক মনসুর উদ্দিন খান অভিযোগ করেন, মেলায় সবচেয়ে নিম্নমানের ব্যাগ সরবরাহ হয়ে থাকে। কারণ এসব ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের কোনো ঠিকানা নেই, তাই জবাবদিহিতা নেই। কম দাম পেলেই ক্রেতা কিনতে শুরু করে। যারা এ শহরে নিয়ম-নীতি মেনে ব্যবসা করছে তাদের ক্ষতি করোনার ফলে অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি হবে।

ফেনী এ্যালুমিনিয়ামের সত্ত্বাধিকারী সোহেল বলেন, মেলার দোকান বরাদ্দ নেয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সুযোগ পাননা। মেলার ব্যবসায়ীরা অধিকাংশই অন্য জেলার। তারা ফেনী থেকে টাকা কামিয়ে চলে যায়, দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির মুখে পড়তে হয় আমাদের। আমরা বহুবার মেলা আয়োজন নিয়ে আপত্তি জানালেও কোন লাভ হচ্ছে না। ফেনীর ব্যবসায়ীদের স্বার্থে এ সমস্ত মেলা বন্ধের দাবি জানান তিনি।

বাপ্পি নামে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, মানহীন রংচটা পণ্যে সয়লাব এই মেলার কারণে একদিকে যেমন ঠকছে ক্রেতারা, অন্যদিকে মাসের পর মাস চলা এই মেলায় চরম আর্থিক ক্ষতি গুনতে হয় ফেনীর শত শত ব্যবসায়ীদের। করোনার এই প্রতিকূলতার মূহুর্তে ফেনীর ব্যবসায়ীদের কথা চিন্তা করে অন্তত এ বছর মেলা যেন বন্ধ রাখা হয় দাবি জানাচ্ছি।

ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি ও ক্ষোভ প্রসঙ্গে ফেনী শহর ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক পারভেজুল ইসলাম হাজারী বলেন, করোনায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অস্তিত্ব তলানীতে। মেলাগুলোতে ওয়ান টাইম প্রকৃতির পণ্যের পসরা বসে। ক্রেতা এসব নকল ও নিম্নমানের পণ্যে আকৃষ্ট থাকে। ফলে শহরের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে পড়ে ক্রেতাশূণ্য। তিনি অভিযোগ করেন, এ মেলায় স্থানীয় বা বাইরের কোন উদ্যোক্তারা অংশগ্রহণ করেন না। তাদের পণ্যও এখানে প্রদর্শন করা হয় না।

ব্যবসায়ীদের ক্ষতির বিষয়ে মেলার পরিচালক ইসলাম খান পিন্টু বলেন, এখানে যারা স্টল নেয় তারা ভাসমান এবং নিম্ন আয়ের মানুষ। মেলা জমতে দশ হতে বারো দিন সময় পার হয়। মেলায় যে পরিমাণ বিনিয়োগ করা হয়, অবশিষ্ট দিনে পুঁজি উঠে আসে না। এ বছর করোনার কারণে মেলায় অংশগ্রহণকারী অনেক ব্যবসায়ীর কাছে পুঁজি নেই। আমরা তাদের পুঁজি দিচ্ছি। তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মেলা শেষ করা হবে বলে জানান তিনি।

ফেনী জেলা প্রশাসক মো: ওয়াহিদুজজামান বলেন, মেলার জন্য এখনও লিখিত অনুমোদন প্রদান করা হয় নি। তবে আমাদের কাছে পুলিশ প্রতিবেদন হাতে এসেছে। প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে মেলার অনুমতি দেয়া হবে।

জেলা প্রশাসক আরো বলেন, মেলা শুধু পণ্যের বেচাবিক্রি তা না, এটি একটি বিনোদনের মাধ্যম। মেলায় দেশের বিভিন্ন স্থান হতে হস্তশিল্পসহ অনেক পণ্যের সমারোহ হবে। দেশের অনেকগুলো জেলাতেই এ মেলা চলছে।

Sharing is caring!