ছবির ব্যক্তির নাম আবদুল ওহাব (বয়স ৮৬)। রাজাপুরে একটি মাদ্রাসায় তিনি থাকেন। মানুষের বাড়িতে বাড়িতে যেখানে পারেন খাওয়া দাওয়া করেন। পড়াশোনা বাল্যশিক্ষা অব্দি। তবে তিনি বেশ ইসলামিক জ্ঞান রাখেন। তিনি একটি কবুলিয়ত নিয়ে অফিসে এসে আমাকে বলেন আমার জায়গা বুঝাইয়া দেন আপনি। জিজ্ঞেস করলাম নামজারি করেছেন? তিনি বললেন তা তো জানি না আমার কাছে এই কাগজটা (কবুলিয়ত) আছে, যেটা সাব রেজিস্ট্রি অফিসে পাঁচ মাস ঘুরে অনেক কষ্টে ৭৫০ টাকা ম্যানেজ করে পেয়েছি।

নামজারি করতে কী কী লাগবে তিনি জিজ্ঞেস করলে আমি জানালাম। তারপর জিজ্ঞেস করলেন কত টাকা লাগবে? আমি বললাম ১১৭০/- টাকা। টাকার কথা শুনে তিনি বললেন আমার মরে যাওয়াই ভালো, এই টাকা আমি পাব কোথায়? তারপর তাকে আশ্বস্ত করলাম টাকার জন্য আপনার কাজ থেমে থাকবে না, আপনি দেখেন পারেন কিনা না হয় তো আমি আছি। আবার বললাম আমার মা বাবা করোনা আক্রান্ত, আপনি তাদের জন্য দোয়া করবেন। তিনি সাথে সাথে দোয়া দরুদ পড়ে তাদের রোগমুক্তি কামনা করলেন। আমি আমার অফিস সহকারীকে তাঁর ই নামজারি আবেদনটা করে দিলাম। তিনি আমার ফোন নাম্বার চাইলে তাঁকে আমার ফোন নাম্বারটা দিই।

তিনি কয়েকদিন পর আমাকে কল দিলেন। আমি ভাবলাম তাঁর কাজের জন্য কল দিলেন। অথচ তিনি কল করে তাঁর কাজের ব্যাপারে কোন কথা বলেননি, আমার মা বাবা কেমন আছেন জানতে কল দিলেন। যখন বললাম আব্বু হাসপাতালে, তখনই তিনি বললেন চিন্তা না করতে, তিনি দোয়া করছেন খুব, তাঁরা দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবেন। তারও কয়েকদিন পর তিনি কল দিয়ে জানালেন তিনি আমার মা বাবার জন্য মাদ্রাসায় কোরআন খতম দিয়েছেন। শুনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা আরো বেড়ে গেল।

আমার মা বাবা সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে আসলে আমিও কর্মস্থলে চলে এসে তাঁর কাজটা শেষ করে তাকে জানানোর পরদিন তিনি অফিসে আসেন। অফিসে সকালে আমার সাথে খিচুড়ি খান, জিজ্ঞেস করলাম খিচুড়ি কেমন হলো? তিনি বললেন আমি এর চেয়েও ভালো খিচুড়ি রান্না করে খাওয়াব আপনাকে। আমি বললাম আচ্ছা। তারপর প্রত্যাশিত নামজারি খতিয়ান এবং ডিসিআরটি (ডিসিআর এর পুরো টাকা তিনি ম্যানেজ করতে পারেননি, পরবর্তীতে তাঁকে অবশিষ্ট টাকা সাহায্য করা হয়। তাঁর হাতে তুলে দিয়ে তাঁকে জানাই আপনার জমি আমি আপনাকে অবশ্যই বুঝিয়ে দিব।

এরমধ্যে আমার বদলী অর্ডার হওয়ায় তিনি আমাকে ফোনে না পেয়ে আমার অফিসে ছুটে আসেন এবং বলেন আপনি কেন বদলী হয়ছেন? আমি বললাম, আপনি কীভাবে জানেন? তিনি বলেন লোকজনের কাছ থেকে শুনেছেন, লোকজন ফেইসবুকে দিয়েছেন।

তিনি বলেন, আপনি এইখানে থাকবেন, আপনারে কে বদলী করছে? আমি তাঁর কাছে যাব এবং গিয়ে বলব আপনাকে এইখানে রাখতে। আমি বললাম আচ্ছা। তারপর তাঁকে বললাম আমি আপনার জমিটা বুঝিয়ে দিব।

প্রতিজ্ঞামতো উপজেলা ভূমি অফিস, দাগনভূঞা এর সার্ভেয়ার জনাব আবুল বাশার এবং দানাইকোট ইউনিয়ন ভূমি অফিস এর ইউএলএও জনাব আজম খানকে পাঠিয়ে তাঁকে বন্ধোবস্ত প্রদানকৃত জমিটি বুঝিয়ে দিই।

এরপরও তিনি আমার অফিসে আজও আসলেন এবং আবারো বলেন, আপনি কেন বদলী হয়ছেন, আপনি এইখানে থাকবেন, আপনারে কে বদলী করছে? আমি তাঁর কাছে যাব এবং গিয়ে বলব আপনাকে এইখানে রাখতে। তারপর তাঁকে বললাম আমি যেখানে যাই না কেন আমি আপনার খবর রাখবো। তাঁর একটাই অনুরোধ আমি যেন তাঁর ফোন রিসিভ করি অথবা রিসিভ করতে না পারলেও যেন কলব্যাক করি। এবং যেদিন উপজেলা ছেড়ে চলে যাব তাঁকে যেন বলে যাই।

তিনি প্রতিনিয়ত আমার জন্য দোয়া করেন এবং বলেন আমাকে যেন শতবর্ষী করে। তাঁকে বলি এইটা তো দোয়া না, শতায়ু হলে তো বুড়ো বয়সে আপনার মতো আমার কষ্ট হবে।

তিনি বলেন, কষ্ট হবে না, আমি দোয়া করি। আরো দোয়া করে বলেন, আমি মরে যাব কিন্তু দোয়া করি আপনি যেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হোন, এই ম্যাজিস্ট্রেট না, কয়েকটা থানার ম্যাজিস্ট্রেট। তারপর তিনি আমার একটা কার্ড এবং একটা ছবি চাইলেন। বললাম আপনার কাছে তো আমার নাম্বার আছে কার্ড কেনো? তিনি বলেন যদি নাম্বার মোবাইলে কখনো মুছে যায়!

তারপর জিজ্ঞেস করলাম, ছবি কেন? তিনি বলেন ফেসবুকে দিব। জিজ্ঞেস করলাম আপনার কি ফেসবুক আছে? তিনি বলেন যাদের আছে তাদের দিয়ে দিব, জানাব আপনি আমার কী কী উপকার করেছেন!!

তিনি আমি যাওয়ার দিন আমার সাথে দেখা করতে আসবেন, কথা দিয়েছেন এবং আমাকে বলেছেন আমি যেন তাঁকে না বলে যেন চলে না যাই!

মাসুমা জান্নাত
সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট
দাগনভূঞা, ফেনী

Sharing is caring!