বিশেষ প্রতিনিধি->>

আজ ৬ ডিসেম্বর। ফেনী পাক হানাদার মুক্ত দিবস । ‘৭১র এই দিনে মুক্তিযোদ্ধারা সম্মুখ সমরে পাক হানাদার বাহিনীদের পরাজিত করে ফেনীর মাটিতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছিল। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামে হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার-আলবদর বাহিনীর নৃশংস বর্বরতায় ক্ষত-বিক্ষত হয় ফেনী জেলা। এই দিনে স্বাধীনতাকামী বাঙ্গালীরা শহরে বিজয়ের নিশান উড়িয়ে উল্লাস করে স্বজন হারাদের কান্না ভুলে গিয়েছিল। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পেরিয়ে গেলেও ফেনীতে চিহিৃত ৮টি বধ্যভূমি সংরক্ষণে এগিয়ে আসেনি কেউ।

মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মোতালেব জানান, ফেনী অঞ্চলের মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক হিসাবে কর্মরত তৎকালীন ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম (পরবর্তীতে লে. কর্ণেল অব. বীব বিক্রম) ভারতের বিলোনীয়া ও তৎসংলগ্ন অঞ্চল থেকে ১০ ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অভিযান চালায়। এসময় তারা সীমান্তবর্তী বিলোনিয়া, পরশুরাম, মুন্সিরহাট, ফুলগাজী হয়ে যুদ্ধ করতে করতে এগুতে থাকলে পর্যদুস্ত হয়ে ফেনীর পাক হানাদার বাহিনীর একটি অংশ নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী হয়ে কুমিল্লা সেনানিবাসের রাস্তায় এবং অপর অংশ শুভপুর ব্রীজের উপর দিয়ে চট্টগ্রামের দিকে পালিয়ে যায়।

অপরদিকে মুজিব বাহিনীর (বিএলএফ) ফেনী মহাকুমা কমান্ডার ও ফেনী-২ আসনের সাবেক সাংসদ অধ্যাপক জয়নাল আবদীন এর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা দাগনভুইয়া, রাজাপুর, সিন্দুরপুর হয়ে ফেনী শহরের দিকে এগুতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল আক্রমনে দিশেহারা হয়ে পাক হানাদাররা ৫ ডিসেম্বর রাতে কুমিল্লার দিকে পালিয়ে পায়। সে সময় ফেনী অবাঙ্গালী মহাকুমার প্রশাসক বেলাল এ খানও পাকবাহিনীর সঙ্গে চলে যায়। ফেনী হানাদারমুক্ত হওয়ার কারনে ঢাকা-চট্টগ্রামের সাথে সড়ক ও রেলপথে হানাদার বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ রূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা ফেনী সরকারী কলেজ, তৎকালীন সিও অফিসসহ কয়েকটি স্থানে স্বাধীনতাকামী নিরীহ মানুষকে নির্মম ভাবে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করেছিল। স্বাধীনতার পর জেলার বিভিন্ন স্থানে আটটি বদ্যভূমিতে শহীদদের লাশ সনাক্ত করতে ছুটে বেড়িয়েছিল স্বজন হারারা। মুক্তিযোদ্ধারা জেলায় সবচে বড় বধ্যভূমি (বর্তমানে ফেনী সরকারী কলেজের কলা ভবনের পেছনে) সনাক্ত করলেও আজও তা সংরক্ষণ হয়নি। বর্তমানে এখানে প্রতিনিয়ত ফেনী সরকারী কলেজের পয়ঃনিস্কাশনের বর্জ ফেলা হয়।

মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অমর শহীদদের স্মৃতির ভাস্কর হিসেবে শহরের জেল রোডের পাশে বীর শহীদদের নামের তালিকা সম্মিলিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি স্তম্ভ নির্মান করা হলেও কয়েক বছরে স্মৃতি স্তম্ভের মুক্তিযোদ্ধাদের নাম অস্পষ্ট হয়ে মুছে গেছে। ফেনী সরকারী কলেজের মাঠে বধ্যভূমির পাশে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মান করা হলেও রাতে এখানে বসে মাদকের আড্ডা। কলেজ কর্তৃপক্ষ জেনেও যেন নিরব ভূমিকা পালন করছে।

ফেনী সরকারী কলেজ এলাকার বধ্যভূমি ছাড়াও দাগনভূঁঞার রাজাপুর স্কুল এন্ড কলেজ সংলগ্ন চৌধুরী বাড়ির পার্শ্বে অরক্ষিত বধ্যভূমি, ফুলগাজীর জামমুড়া গ্রামের বধ্যভূমি, পরশুরামের মালিপাথর বধ্যভূমি, একই উপজেলার সলিয়া বধ্যভূমিসহ সনাক্ত না হওয়া বধ্যভূমিগুলো স্বাধীনতার ৪৯ পার হলেও চিহ্নিত কিংবা সংরক্ষিত হয়নি।

ফেনী অঞ্চলের মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) বীব বিক্রম জাফর ইমাম বলেন, ’৭১ এর ৬ ডিসেম্বর ফেনী মুক্ত হলেও পাকহানাদের প্রথম আত্নসমর্পণ ছিলো ফেনীর বিলোনিয়ায়। ১০ ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের বাংলাদেশ-ভারতের বিলোনীয়া ও তৎসংলগ্ন অঞ্চল থেকে অভিযানে চুড়ান্ত বিজয়ের ৩৬ দিন আগে ’৭১ এর ১০ নভেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দু’জন অফিসারসহ ৭২ জন সৈনিক আত্মসমর্পণ করেছিল। তিনি সেই যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

বাঙালি সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম’র (পরবর্তীতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল) অনন্য বীরত্বের জন্য পেয়েছিলেন বীর বিক্রম খেতাব। বিলোনিয়ার যুদ্ধে স্থানটি স্মরণীয় করে রাখতে গেল বছর ওই স্থানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মান করা হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মোতালেব আরো জানান, ’৭১ সালে ১১ জুন রাতে তৎকালীন শান্তি কমিটির নেতা ও বর্তমান জামায়াতের আমির মকবুল আহম্মদের নির্দেশে আলবদররা দাগনভূইয়া উপজেলার জায়লস্কর ইউনিয়নের সিলোনিয়া লালপুর গ্রামের পাল বাড়িতে হামলা চালায়। এসময় হিন্দুপাড়ায় আগুন দিয়ে ১০ জনকে হত্যার করে। একই সময় পাশবর্তী এলাকার খুশিপুর গ্রামের আহসানউল্যাহ নামে অন্য এক মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করে লাশ সিলোনিয়া নদীতে ফেলে দেয় আলবদররা। দেরিতে হলেও সম্প্রতি ওই মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডে তদন্ত শুরু হয়েছে। নৃশংস এই হত্যার সাথে মকবুলসহ যেসকল যুদ্ধাপরাধী জড়িত তাদের আইনের আওয়তায় এনে দৃষ্টান্ত মুলক শাস্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। একই সাথে ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত ফেনীর পলাকত কুখ্যাত রাজাকার চৌধুরী মাঈনুদ্দিনকে দেশে ফিরিয়ে এনে সাজা কার্যকরের জন্য সরকারকে উদ্যোগ নেয়ার অনুরোধ করেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধে ফেনীর অনেকগুলো রণাঙ্গনের মধ্যে সীমান্তবর্তী বিলোনিয়ার যুদ্ধ, মুন্সীর হাটের মুক্তারবাড়ী ও বন্ধুয়ার প্রতিরোধের যুদ্ধ ইতিহাসখ্যাত হয়ে আছে। এ রণাঙ্গনে সম্মুখ সমরের যুদ্ধ কৌশল বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানী মিলিটারী একাডেমীগুলোতে পাঠসূচীর অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যা এ রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের অংহকার আর গর্বের বিষয়। তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্থান দেখতে বিলোনিয়া আসার অনুরোধ জানান বীর মুক্তিযোদ্ধারা।

Sharing is caring!