শহীদুল্লাহ ফরায়জী->>

ধর্ষণের পর নির্যাতিতের সাথে ‘সমঝোতা’র মাধ্যমে বিয়ে নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এটি ফেনীর একটি ঘটনা। দুই বছরের প্রণয়ের পর বিয়ের প্রলোভনে অভিযুক্ত জিয়াউদ্দিন ধর্ষণ করে মেয়েটিকে। বিয়ে করতে অস্বীকার করায় দায়ের হয় মামলা। ওই মামলায় কারাগার থেকে ভিকটিমকে বিয়ে করার শর্তে জামিন চান আসামী। ভিকটিমের সম্মতি থাকলে কারাফটকে বিয়ের আয়োজন করতে নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। আদালতের এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে নারীবাদী সংগঠনগুলো। মামলার শুনানি কালে হাইকোর্ট বলেন,যে যাই সমালোচনা করুক,আমরা এ ধরনের বিয়ের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখছি। হাইকোর্ট জিয়াউদ্দিনকে এক বছরের অন্তর্বর্তীকাল জামিন দেয়।
আদালত বলেন, অভিযুক্ত যদি শুধু জামিন পাওয়ার জন্যই বিয়ে করে থাকে তাহলে জামিন বাতিল হবে।

আসামি জামিন চেয়েছেন বিয়ে করার শর্তে। আদালতও এই শর্ত দিয়ে জামিন দিয়েছেন। আসামির শর্ত এবং আদালতের শর্ত একটাই ‘বিয়ে’। এই শর্ত পূরণ করার পর কেন তার জামিন বাতিল করা হবে তা বোধগম্য নয়। আসামি তো অন্য কোনো প্রতিশ্রুতি আদালতে দেয়নি। আর আসামি নৈতিকতার কোন স্তর থেকে বিবাহ সম্পন্ন করেছে তা নির্ধারণ করা আদালত বা কারো পক্ষে সম্ভব না।

আদালত আরো বলেছেন, আমরাতো ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষণের শিকার মেয়ের বিয়ে দিতে বলিনি। ছেলেটি বিয়ের শর্তে জামিন চেয়েছে। এরপরই আমরা আদেশ দিয়ে বলেছি মেয়েটির সম্মতি থাকলে বিয়ে হতে পারে। পরে ছেলে ও মেয়ের সম্মতিতে বিয়ে হয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, বিয়ে যদি ছেলেটির ‘ইচ্ছাধীন’ হয় তাহলে কারাফটকে বিয়ে সম্পন্ন করতে আদালতের নির্দেশ কেন প্রয়োজন হলো! কারাফটকে বিয়ে করা আমাদের সমাজের রীতি নয়, এমনকি সম্মানজনক বা আনন্দপূর্ণও নয়।

শুধু বিয়ের শর্তে যদি আসামির জামিন হয়, আর কারাফটকে বিয়ে হয়, তাহলে নিকটবর্তী সময়ে কারাফটকে ‘কাজী অফিসে’র শাখা খুলতে হবে।

ধর্ষণ হলো সম্মতিবিহীন জবরদস্তি যা একটি গুরুতর অপরাধ, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। বিয়ে হচ্ছে নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একত্র জীবনযাপনের নৈতিক এবং আইনী অনুমোদন।

ধর্ষণের মত বর্বরোচিত কাজ করার পর অনুকম্পা পেয়ে ধর্ষক যদি বিয়ের আসরে বর সাজার সুযোগ পায় তাহলে মানুষের চেতনার উপর ‘আত্মনিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা স্থাপনের তাগিদ বিনষ্ট হবে কিনা তার গভীর অনুসন্ধান প্রয়োজন।

এ ধরনের পদক্ষেপ ব্যক্তির নিজের, অপরের বা সমাজের উন্নতি বা মঙ্গল সাধনে আদৌ কোন ভূমিকা রাখার সুযোগ সৃষ্টি করে কিনা তাও পর্যালোচনা প্রয়োজন।

আমাদের মনে রাখা দরকার, অপরাধ যেন ‘গৌরবে’র কারণ হয়ে না উঠে। নিজের বা অপরের দেহ বা চিত্তকে পন্থারূপে ব্যবহার করা অনৈতিক। একটু অনুকম্পা বড় ধরনের সামাজিক দুর্দশার উৎস হয়ে যাবে কিনা তাও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে।

কোন কোন ‘অনুকম্পা’ নৈতিকতার জন্য প্রচন্ড বিপদজ্জনক। বিদ্যমান সমাজের গতি প্রকৃতি, মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও মনস্তত্ত্বকে গভীর পর্যালোচনা করা দরকার।
আদালতের কাছে এক ব্যক্তির মধ্যে একটি ছেলে এবং একটি ধর্ষকের অস্তিত্ব দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে ছেলেটিকে ধর্ষক থেকে আলাদা করা যায় না সুতরাং জামিন এবং বিয়ে দুটোই ধর্ষকের সাথে সম্পর্কিত।

দেশের প্রাপ্তবয়স্ক কোন যুবক বিয়ের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হতে হয় না। সুতরাং সে আদালতে সোপর্দ হয়েছে প্রাপ্তবয়স্ক যুবক হিসেবে নয় অপরাধী হিসেবে।

প্রথমত প্রশ্ন হচ্ছে ধর্ষণের শিকার নারী তাঁর ‘মানবিক মর্যাদা’ হারিয়েছে। ধর্ষক ধর্ষণের মাধ্যমে বিয়ের কোন নৈতিক দায়িত্ব কর্তব্য পালন করেনি। সুতরাং বিয়ের গুরুত্বপূর্ণ ‘নৈতিক বিধি’কে আমরা যদি অনৈতিকভাবে উল্টে দেই তাহলে ফলশ্রুতি খুবই বিভ্রান্তিকর। বিয়ের জন্য ধর্ষণ কোন গ্রহণযোগ্য অনুশাসন নয়। এসব প্রশ্নে আমাদের আরও সতর্কতাপূর্ণ মনোযোগ এর প্রয়োজন।

মর্যাদা হচ্ছে পরম। মর্যাদার মূল্য শর্তনিরপেক্ষ। মর্যাদার সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা হতে পারে না, তুলনা করতে গেলে মর্যাদার পবিত্রতা নষ্ট হয়।
মনুষ্যজাতির মানবোচিত মর্যাদাই অন্য প্রাণীদের চেয়ে তাকে পার্থক্য করেছে।
মানুষের বেঁচে থাকা মানে জীবনের সর্বদিককে মর্যাদাদানের নিরন্তর প্রচেষ্টা। মানুষ যুগে যুগে মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্যই আত্মদান করে থাকে, নিরন্তর লড়াই করে থাকে।

জীবনের ‘মর্যাদা’ বিনষ্ট করার এখতিয়ার কোন ব্যক্তির কেন রাষ্ট্রেরও নেই। রাষ্ট্র অনেক সময় ব্যক্তির মৌলিক নাগরিক অধিকার হরণ করতে পারে কিন্তু ব্যক্তির মর্যাদা হরণ করার ক্ষমতা রাষ্ট্রের নেই। রাষ্ট্র মানবিক মর্যাদা হরণ করতে পারে এমন কোন আইন প্রণয়ন করতে পারেনা। কারণ আইনের ভিত্তি হচ্ছে ‘মানবিক মর্যাদা’ সুরক্ষা দেওয়া। বিশ্বের বহু দেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে সকল আইনের ভিত্তি হবে মানবিক মর্যাদা।

এই মর্যাদা রক্ষা করতে মানুষ যদি ব্যর্থ হয় তাহলে মানুষ ক্রমাগত ‘উপমানবিক স্তরে’ অধঃপতিত হয়। প্রাণী সুলভ ইন্দ্রিয় ও তার ক্রিয়া-কলাপ নিয়ন্ত্রিত করার মধ্য দিয়ে মানুষ তার মানবিক সত্তা প্রতিষ্ঠা করছে।

আর্নল্ড টয়েনবি বলেছেন যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানবিক মর্যাদা বজায় রাখা, আর মানুষের কার্যাবলীর এ ক্ষেত্রটিতে মর্যাদা আরোপের যা অপরিহার্য শর্ত তা হল প্রেম নামক একটা আত্মিক গুণের সাহায্যে যৌন সম্পর্ককে মানবীয় করে তোলা। প্রেম এবং মর্যাদা থেকে মানবের যৌন সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যদি কেবল পাশব ক্ষুধা তৃপ্তির উপায় মাত্র পর্যবসিত হয় তবে তার আত্মিক অধঃপতন ঘটে। মানুষের জীবনে প্রেম ও মর্যাদাহীন যৌন আচরণ এমনকি শুধু পাশবিক নয় আত্মিক ও নৈতিক দিক থেকে পশু অপেক্ষা নিম্ন পর্যায়ের।

সুতরাং ধর্ষক ‘আত্মিক’ ও ‘নৈতিক’ দিক থেকে নিম্ন পর্যায়ের। সে ধর্ষণের শিকার নারীর সমগ্র জীবনকে অভিশপ্ত করে দেয়।

আমাদের রাষ্ট্রে আইন প্রণীত হয়েছে ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। অর্থাৎ ধর্ষণের কারণে ধর্ষক আবার বেঁচে থাকার অধিকার হারায়। যদি সমঝোতার মাধ্যমে সে ‘মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত না হয়ে, বিয়ের মাধ্যমে সুখভোগের জীবন লাভ করে এবং জীবনকে মহিমান্বিত করে তাহলে অপরাধ কোন অনুতাপের বিষয় হবে না, অপরাধ আনন্দলাভের উৎস হবে। অপরাধ ‘তিরস্কার’ যোগ্য হবে না ‘পুরস্কার’ যোগ্য হবে।

যার মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে ফাঁসিকাষ্ঠে যাওয়ার কথা, জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটার কথা কিন্তু ফাঁসিরকাষ্ঠের পরিবর্তে ফুলশয্যা… এতে সমাজের মানবিক হবার অনুপ্রেরণা বাধাগ্রস্ত হবে।
পৃথিবীতে মৃত্যুদণ্ড মানুষের জীবনের সর্বোচ্চ শাস্তি। এই সর্বোচ্চ শাস্তির পরিবর্তে যদি বিয়ের ব্যবস্থা হয় তাহলে ‘বিয়েও’ শাস্তির নামান্তর কিনা এটাও রসিকতার বিষয় হয়ে উঠবে।

ধর্ষণের পর বিয়ে নারীর মানবিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে পারে না। ধর্ষণের কারণে নির্যাতিতার চরম মানসিক ক্ষতের জন্ম হয় যা থেকে বাকি জনম তার পরিত্রাণ মেলে না। জীবনের মর্যাদাবোধের লড়াইয়ের তাগিদ থেকে প্রতিকারের আশায় সে আইনের আশ্রয় লাভের সচেষ্ট হয় ।

ধরে নিলাম সমঝোতায় বিয়ে হলো, বিয়ের কয়েকদিন পর চূড়ান্ত রায়ে আদালত কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হলো ধর্ষক। প্রথমে ‘ধর্ষণ’ পরে আদালতের নির্দেশে ‘বিয়ে’ এবং ‘বাসর’ তারপর মৃত্যুদণ্ডের কারণে ‘বিধবা’ এতে ধর্ষিতার সামাজিক জীবন ও মানসিকভাবে কী প্রতিকার নিশ্চিত হবে?
‘ধর্ষণ’ যদি ‘বিয়ে’কে নিশ্চিত করে তাহলে সমাজে ধর্ষণের ভয়াবহতা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে কিনা?

একজন ধর্ষক যদি বিয়ের শর্তে জামিন লাভ করে তাহলে গণধর্ষণকারীরা জামিন এবং বিয়ের প্রশ্নে তাদের অভিপ্রায়ের প্রতিকার কী ভাবে পাবে? সকলের জন্যই ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকারের সুরক্ষা দিতে হবে।

কান্টের মতে এই জগতে হোক কিংবা এই জগতের বাইরে হোক একমাত্র সদিচ্ছা (good will) ছাড়া অন্য কোন বস্তুকে বিনাশর্তে ও নিরঙ্কুশভাবে ভালো বলার উপায় নেই। ‘সদিচ্ছা’ই একমাত্র বস্তু যার মূল্য পরিস্থিতি, পরিবেশ, আপেক্ষিকতা ও শর্তের ঊর্ধ্বে। অতএব সুখভোগ করার উপযুক্ত পাত্র হতে গেলেও, অবশ্য ও অপরিহার্যভাবে, সদিচ্ছা নামক গুণের প্রয়োজন।

অভিজ্ঞতাবাদ ও সংশয়বাদের প্রধান দার্শনিক ডেভিড হিউম এর লক্ষ্য ছিল মানবীয় উপলব্ধি সম্পর্কে গভীরে অনুসন্ধান পরিচালনা, নিগূঢ় অনুসন্ধানকে স্পষ্টতা দান এবং সত্যের সঙ্গে অভিনবত্ব যোগ করে বিভিন্ন ধরনের দর্শনের সীমান্তকে এক করা।

আমাদের আইন প্রণয়নকারী এবং আইন প্রয়োগকারী সকলের আরো অধিকতর নৈতিক সমীক্ষার প্রয়োজন।

লেখক: শহীদুল্লাহ ফরায়জী
গীতিকার
০৫.১২.২০২০

Sharing is caring!