বিশেষ প্রতিনিধি->>

ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় একবছর আগে আজকের এই দিনে (২৪ অক্টোবর) ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদন্ড দিলেও উচ্চ আদালতে আপিল শুনানিতে ঝুলে আছে মৃত্যুদন্ড কার্যকর।

দেশব্যাপি আলোচিত হত্যাকান্ডের ঘটনার সাত মাসের মাথায় ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের ততকালীন বিচারক মামুনুর রশীদ ১৬ আসামির প্রত্যেককে মৃত্যুদন্ড ও প্রত্যেক আসামীকে একলাখ টাকা করে জরিমানা দন্ডে দন্ডিত করেন। অধ্যক্ষের যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদ করায় আগুনে দগ্ধ হয়ে পুড়ে মারা যায় আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি।
ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামী খালাস চেয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করায় দীর্ঘ এক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও রায় কার্যকর না হওয়ায় স্বজনদের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
মামলার বাদি নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান জানান, ‘আমরা বিচারিক আদালতে ন্যায় বিচার পেয়েছি। রায়ের এক বছর অতিবাহিত হলেও সাজা কার্যকর না হওয়া আমরা হতাশ। জরুরী ভিত্তিতে উচ্চ আদালতের আপিল শুনানী শেষে দ্রুত সাজা কার্যকরের দাবী জানাচ্ছি। দ্রুত রায় কার্যকর হলে নুসরাতের আত্মা শান্তি পাবে।’

বাদীপক্ষের আইনজীবী এম. শাহজাহান সাজু জানান, বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘নজিরবিহীন’ রায় হয়েছিলো নুসরাতে রায়টি। চার্জ গঠনের ৬২ কার্যদিবসে শুনানির পর রায় দেওয়া হয়েছিলো। রায়ের ৫ দিনের মাথায় ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর আসামিদের মৃত্যুদন্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য (ডেথ রেফারেন্স) মামলার যাবতীয় কার্যক্রম হাইকোর্টে পাঠানো হয়। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পৌঁছার পর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পেপারবুক (মামলার যাবতীয় নথি) ছাপানো শেষ করা হয়েছিলো। পরে প্রয়োজনীয় কাজ শেষে শুনানির জন্য মামলাটি প্রধান বিচারপতি বরাবর উপস্থাপন করা হয়।

তিনি আরো জানান, আপিল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য বেঞ্চ গঠন করেছিলেন প্রধান বিচারপতি। বিচারপতি হাসান ইমাম ও সৌমেন্দ্র সরকার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে এ মামলার শুনানির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে করোনাভাইরাসের কারণে হাইকোর্টের কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যাওয়ায় শুনানির জন্য তারিখ ঘোষনা করা যায়নি। করোনা ভাইরাসের সংকটময় পরিস্থিতি কেটে গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আগামী ডিসেম্বরে মামলাটির শুনানী হতে পারে বলে জানিয়েছেন এই আইনজীবী।

মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামীরা হলো- সোনাগাজীর চরকৃষ্ণজয়ের কলিম উল্যাহ সওদাগার বাড়ীর কলিম উল্যার ছেলে এসএম সিরাজ-উদ-দৌলা (৫৭), চরচান্দিয়া ইউনিয়নের উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের মো. আহসান উল্যাহর ছেলে ও মাদ্রাসা ছাত্রদলের কথিত সভাপতি নুর উদ্দিন (২০), চরচান্দিয়া ইউনিয়নের ভূইয়া বাজারে এলাকার নবাব আলী টেন্ডল বাড়ী মো. আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে ও মাদ্রাসা ছাত্রলীগের কথিক সভাপতি শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর, পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক (সদ্য সাবেক) ও চরগণেশ গ্রামের পান্ডব বাড়ীর আহসান উল্যাহ ছেলে মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ আল কাউন্সিলর (৫০), উপজেলার পূর্ব তুলাতলী গ্রামের খায়েজ আহাম্মদ মোল্লা বাড়ীর আবুল বাশারের সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের সৈয়দ সালেহ আহাম্মদের বাড়ীর রহমত উল্যাহ ছেলে জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ (১৯), সফরপুর গ্রামের খান বাড়ীর আবুল কাশেমের ছেলে হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রী) মাদ্রাসার ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক ও উত্তর চারচান্দিয়া গ্রামের সওদাগর বাড়ীর ইবাদুল হকের ছেলে আবছার উদ্দিন (৩৩), চরগণেশ গ্রামের আজিজ বিডিআর বাড়ীর আব্দুল আজিজের (পালক বাবা) মেয়ে কামরুন নাহার মনি (১৯), লক্ষীপুর গ্রামের সফর আলী সর্দার বাড়ীর শহিদুল ইসলামের মেয়ে ও মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ-উদ-দৌলার ভাগ্নি উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ওরফে তুহিন ওরফে শম্পা ওরফে চম্পা (১৯), পূর্ব চরচান্দিয়া গ্রামের সোজা মিয়া চৌকিদার বাড়ীর আব্দুল শুক্কুরের ছেলে আব্দুর রহিম শরীফ (২০), চরগণেশ গ্রামের হাজী ইমান আলীর বাড়ী ওরফে মালশা বাড়ীর জামাল উদ্দিন জামালের ছেলে ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), চরগণেশ গ্রামের এনামুল হকের নতুন বাড়ীর এনামুল হক ওরফে মফিজুল হকের ছেলে ইমরান হোসেন ওরফে মামুন (২২), তুলাতলী গ্রামের আলী জমাদ্দার বাড়ীর সফি উল্যাহ ছেলে মোহাম্মদ শামীম (২০), সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও চরচান্দিয়া গ্রামের ভূইয়া বাজার এলাকার কোরবান আলী বাড়ীর কোরবান আলীর ছেলে রুহুল আমিন (৫৫), উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের বোর্ড অফিস সংলগ্ন রুহুল আমিনের নতুন বাড়ীর মো. রুহুল আমিনের ছেলে মহিউদ্দিন শাকিল (২০)।

এদিকে রায়ের এক বছর পর নুসরাতের বাড়িতে যেয়ে দেখা যায়, এখনো ওই বাড়িটিতে পুলিশ পাহারায় নিয়োজিত রয়েছে। নুসরাতের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা কাজ করছে পুলিশ সদস্যরা। তবে বাড়িতে এখনো প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেনি। নুসরাতের বাবা, মা ও দুই ভাই এখনো তার স্মৃতিরোমান্থন করে কেঁদে ওঠে।

অপরদিকে নুসরাতের শ্লীলতাহানীর ঘটনায় তাকে থানায় ঢেকে জিজ্ঞাসাবাদের ভিডিও ধারণ করে তা প্রচারের ঘটনায় ব্যারিস্টার ছায়েদুল হক সুমন সাইবার ট্রাইবুনাল আদালতে আইসিটি আইনে একটি মামলা দায়ের করেছিলেন। সেই মামলায় গত বছরের ২৮ নভেম্বর রায় ঘোষণা করেন বিচারক মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন। রায়ে ওসি মোয়াজ্জেমের ৮ বছরের জেল ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা করে ট্রাইব্যুনাল। যেটি বাংলাদেশের প্রথম সাইবার ট্রাইব্যুনালের প্রকাশিত রায় ছিলো।

প্রসঙ্গত, অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধ শ্লীলতাহানীর অভিযোগ প্রত্যাহার না করায় ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষার কেন্দ্রের থেকে ছাদে ঢেকে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে নুসরাতকে হত্যার চেষ্টা করে তার সহপাঠীরা। এতে তার শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়। পরে চিকিৎসাধিন অবস্থায় ৯ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পরই ঘটনাটি দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশী গণমাধ্যমেও সমালোচনার ঝড় তোলে। ঘটনাটি জড়িতদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবীতে রাস্তায় নেমে আসে আন্দোলনকারীরা। এ ঘটনায় নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

Sharing is caring!