ফুলগাজী প্রতিনিধি->>

ফুলগাজী উপজেলার আনন্দপুর ইউনিয়নের হাসানাপুরে পৈত্রিকভিটায় চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও মুকুল নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ের রেক্টর আমীর আহমেদ চৌধুরী রতন। শুক্রবার রাত ৯টায় ফুলগাজী উপজেলার আনন্দপুর ইউনিয়নের হাসানপুর চৌধুরী বাড়ী প্রাঙ্গণে নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়।

জানাযায় আওয়ামীলীগ জাতীয় পরিষদ সদস্য ও সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুর রহমান বি.কম, ফেনী পৌরসভার প্যানেল মেয়র আশ্রাফুল আলম গীটার, অ্যাডভোকেট শাহজাহান সাজু, মরহুমের ছেলে অনুপ চৌধুরী, তার ভাতিজা ও ফেনী জেলা আওয়ামী যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) চৌধুরী আহমেদ রিয়াদ আজিজ রাজীব প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে বেলা ১১টায় ময়মনসিংহ ঈদগাহ ময়দানে তার জানাজা হয়। এতে ইমামতি করেন মাওলানা আব্দুল্লাহ আল মামুন। জানাজার আগে মরহুমের আত্মার মাগফিরাত চেয়ে বক্তব্য দেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ, সংসদ সদস্য ফাহমী গোলন্দাজ বাবেল, জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমান, স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আফজালুর রহমান বাবু, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আমিনুল হক শামীম, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল, মরহুমের ছেলে অনুপ চৌধুরী প্রমুখ।

গত বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ১১টার দিকে ঢাকার শ্যামলীতে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। আমীর আহমেদ ময়মনসিংহে পরিচিত ছিলেন ‘রতন স্যার’ নামেই। তার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। ৭৭ বছরের জীবনের ৫৬ বছর তিনি কাটিয়েছেন শিক্ষকতা করে। ময়মনসিংহের ক্রীড়াঙ্গন ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গেও জড়িয়ে আছেন আমীর আহমেদ চৌধুরী রতনের নাম। সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী হয়ে নির্বাচনও করেছিলেন তিনি।

১৯৪৩ সালের ৮ নভেম্বর ফুলগাজীর হাসানপুর চৌধুরী বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন আমির আহমেদ চৌধুরী রতন। তবে তার বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা ময়মনসিংহ শহরেই। শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তার ঠিকানা ছিল শহরের মহারাজা রোড। ১৯৫৬ সালে তিনি সিটি কলেজিয়েট স্কুল থেকে দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর ১৯৫৮ সালে আনন্দ মোহন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ও ১৯৬০ সালে একই কলেজ থেকে বিএ পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে মেধা তালিকায় নবম স্থান নিয়ে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন। ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব এডুকেশন এক্সটেনশন এন্ড রিসার্চ (নায়েম), ঢাকা শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ১৯৯১ সালে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তিনি।

১৯৬৪ সালের আগষ্ট মাসে ময়মনসিংহের গৌরীপুরে অধ্যাপনার মাধ্যমে শুরু হয় আমির আহমেদ চৌধুরীর শিক্ষকতার জীবন। গৌরীপুর কলেজে তিনি ছিলেন ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত। ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তিনি যোগ দেন মুকুল নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে। ২০১৪ সাল থেকে তিনি স্কুলের রেক্টরের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে শুরু থেকে অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও ময়মনসিংহের গৌরীপুর অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেছেন। আত্মগোপন থাকা অবস্থায় ময়মনসিংহ শহরে মুক্তিযুদ্ধের কর্মকান্ড পরিচালনার সময় পাকবাহিনী কর্তৃক ১৪ নভেম্বর ১৯৭১ হাতে আটক হয়ে অবর্ণনীয় অত্যাচার ও নির্যাতন ভোগ করেন তিনি।

তিনি ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামীলীগের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া ১৯৯৬ সালের ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন রতন চৌধুরী। তাঁর উদ্যোগেই ১৯৫৯ সালে ময়মনসিংহ জেলা মুকুল ফৌজ প্রতিষ্ঠা হয়।

ময়মনসিংহের শিক্ষা, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াঙ্গনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি অবদান রেখেছেন। জীবদ্দশায় জেলা ক্রীড়া সংস্থার সিনিয়র সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি ময়মনসিংহ শাখার সাধারণ সম্পাদক, জেলা নাগরিক আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, সার্বজনীন বাংলা নববর্ষ উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি ময়মনসিংহ শাখার আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ৭ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান তার বড় ভাই ফেনীর বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আজিজ আহমেদ চৌধুরী। সেসময় ফেনীতে এসে কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন আমির আহমেদ চৌধুরী। অংশ নিয়েছিলেন বড় ভাইয়ের শোক, স্মরণ সভাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে।

এর আগে ২০১৩ সালের ১৯ এপ্রিল মারা যান তাদের ছোট ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল আমীন আহমেদ চৌধুরী বীর বিক্রম। চার ভাইয়ের মধ্যে আজিজ আহমেদ চৌধুরী ছিলেন পরিবারের সবার বড়, আমির আহমেদ চৌধুরী দ্বিতীয়, আমিন আহমেদ চৌধুরী তৃতীয় ও আনিস আহমেদ চৌধুরী ৪র্থ সন্তান।

Sharing is caring!