কাজল ঘোষ->>

প্রশ্নটি অনেকের কাছেই অবান্তর মনে হতে পারে। খানিকটা অযৌক্তিকও ভাবতে পারেন কেউ কেউ। কিন্তু হালের এই নতুন ট্রেন্ড নিয়ে কিছু প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তা হচ্ছে ‘ভাইরাল’। সামাজিক মাধ্যম এখন বাস্তবতা। এটা কারও পক্ষেই অস্বীকার করার যো নেই। তাই বলে বিচার, অবিচার, সুবিচার, ন্যায়বিচার সবকিছুই কি ভাইরাল হওয়ার ওপর নির্ভর হয়ে পড়বে।

অতি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বেশকিছু ঘটনা মনে দাগ কেটেছে।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের ঘটনা তার নজির। যিনি নির্যাতনের স্বীকার হলেন তিনি এবং তার পরিবার পেশি শক্তির ভয়ে চেপে গেলেন। নির্যাতিতাকে নাজেহাল করতে সেই ধারণকৃত ভিডিও ভাইরাল করল নরপশুরাই। তারপর দেশ জানল, দুনিয়ায় রটল এবং তৎপরের ঘটনাতো চলমান।

অবাক বিষ্ময়ে লক্ষ্য করবেন, ঘটনা সংগঠনের বত্রিশ দিন পর সকলেই জানল। আর এই বত্রিশদিন সকলেই নীরব দর্শক। কি প্রশাসন? কি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি? কি এলাকাবাসী? পুলিশসহ অন্যরাও। তাহলে বলতে হচ্ছে, সকলেই কি ভাইরাল হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন এতদিন। নাকি মজা দেখার অপেক্ষায় ছিলেন?

আমি সামাজিক মাধ্যমের বিপক্ষে নই। কিন্তু আইনের চাকা যদি সঠিক গতিতে বইয়ে নিতে ভাইরালের অপেক্ষায় থাকতে হয় তাহলে তো সমাজের সকল ন্যায়বোধ, কল্যানবোধ, নীতি নৈতিকতা সব উবে যাবে। যেসব ঘটনা ভাইরাল হয়নি সেসবের বিচারের বাণী নীরবে কাঁদবে, কাঁদতেই থাকবে।

বরগুনার মিন্নির ঘটনা সকলেরই জানা। আদালতে বিচারাধীন। এই ঘটনার ছবি এবং ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। দেশজুড়ে দু বছর আগের এই ঘটনাচিত্র আলোড়ন তুলেছিল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নয়ন বন্ডরাতো একদিনে জন্মায়না। সেখানে একজন দুজন নয় শতাধিক কিশোর অপরাধে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিন। প্রশাসন সবকিছুই অবগত। স্থানীয় রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় এরাই বহুবিদ অপরাধে জড়িয়ে আছে। বোধকরি এই কিশোর অপরাধীরা জানে কিছুই হবে না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ভাইরালের অপেক্ষায় না থাকলে আইনের গতি সঠিক প্রবাহে চললে এ ধরণের ঘটনাই ঘটতো না। ফেনীর নুসরাতের কথা কি আমরা ভুলতে বসেছি। সেখানে থানার ওসি নিজেই তার জিজ্ঞাসাবাদ ভিডিও করে ভাইরাল করেছেন। এটা কি একধরণের সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হচ্ছে না? এটা কি একধরণের বিকৃত মানসিকতা নয়?

সবশেষ একটি ঘটনার ভাইরাল এবং তার প্রতিক্রিয়া এই লেখাটিতে উল্লেখ করতে চাই। রিকশা চালক ফজলুর রহমানের কান্না সকলের মন ছুঁয়েছে। ঘটনাটি নিন্দনীয় বটেই। একজন মানুষ তার বাঁচার অবলম্বন হারিয়েছে। তার চাল চুলো বলতে এই ছিল। প্রশাসনের উচ্ছেদ নামক যন্ত্রের থাবায় তাকে নিঃশ্ব হতে হয়েছে। তার সহায়তায় অনেকেই এগিয়ে এসেছেন এটিও সুখবর। কিন্তু আটকে যাচ্ছি একটি জায়গাতেই ‘ভাইরাল’। ফজলুর রহমানের কান্নাকে ভাইরাল হতে হয়েছে। কিন্তু বাকিদের কান্না ভাইরাল না হওয়ায় ওদের জীবন তো ফাঁদে আটকে আছে। আর এই ফজলুকে সহায়তা দিয়েও অনেকেই ভাইরাল হওয়ার চেষ্টা করছেন। দুটি চিত্র নিয়ে সামাজিক মাধ্যমেও আলোচনা চলছে।

সিনিয়র সাংবাদিক সুপন রায় তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, উচ্ছেদে ক্ষতিগ্রস্থ হলেন একজন রিকশাচালক! তাঁর দু:খী চেহারা, করুন চাহনি-আমাদের সবার অন্তর ছুঁয়েছে! তাঁর সংকটের প্রাথমিক সমাধানের কথা গতকালই শোনা গেছে। শুনে বেশ ভাল লেগেছিল। কিন্তু তাতে থেমে গেলে কী আমাদের চলবে? ওই উচ্ছেদে তাঁর সঙ্গে আরো অনেক চালক ক্ষতির মুখে পড়েন। তারাও কিন্তু গরিব। কিন্তু তাদের সবাইকে না করে, কেবল একজনের পেছনে কেন সবাই সাহায্য করতে মরিয়া হয়ে উঠল? জানেন তা? উত্তর পরিষ্কার। ‘ভাইরাল’। তাঁরটা ভাইরাল হয়েছে, অন্যদেরটা হয়নি। ‘ভাইরাল’ না হলে রেপিস্ট ধরা পড়ে না । ‘ভাইরাল’ না হলে মামলা হয় না। ‘ভাইরাল’ না হলে তাই নগদ সাহায্যও মেলে না। ‘ভাইরাল’ ফিভারে ভুগছে দেশ।

শেষ করতে চাই কজন ব্যক্তিত্বের কথা বলে। আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ। খ্যাতনামা শিক্ষক, আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর। অন্যজন ভেলরি টেলর। পক্ষাঘাতগ্রস্থদের জন্য যিনি আজীবন কাজ করে যাচ্ছেন। একজন আলোকিত মানুষ গড়তে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র গঢ়েছেন আর অন্যজন সিআরপি গড়েছেন। এই দুজন ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করছি তাদের নীরব অবদানের জন্য। তাঁরা কেউই ভাইরাল হওয়ার জন্য কিছু করেন নি। দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করেছেন। আসুন, আমরাও ভাইরাল হওয়া বা ভাইরালের অপেক্ষায় না থেকে দেশের জন্য, নীতির জন্য, সুশাসনের জন্য অকাতরে কাজ করি।

সূত্র : দৈনিক মানবজমিন

Sharing is caring!