বিশেষ প্রতিনিধি->>

ফেনীর নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত উম্মে সুলতানা পপি, কামরুন নাহার মনি ও বরগুনায় রিফাত শরিফ হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ৪৯ জন নারী বন্দী কনডেম সেলে রয়েছে। তাদের নিয়ে দেশে মোট ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ১৯০৪ জন বন্দী দেশের ৬৮ কারাগারের কনডেম সেলে আছেন। দেশে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত অনেক পুরুষের ফাঁসির দন্ড কার্যকর হলেও এখন পর্যন্ত কোনো নারীর ফাঁসি কার্যকর হয়নি।

কারা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, আদালতে ফাঁসির রায় ঘোষণার পর আসামিকে কারাগারের কনডেম সেলে নেওয়া হয়। ফাঁসি কার্যকর হওয়ার আগপর্যন্ত আসামিদের কনডেম সেলেই রাখা হয়। গত বছরের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নুসরাত জাহার রাফি হত্যা মামলায় দুই নারীসহ ১৬ জন আসামী সকলের ফাঁসির আদেশ দেন আদালত। চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী সকল সাজাপ্রাপ্তদের কারাগারের কনডেম সেলে নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি (গত বুধবার) রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় তাঁর স্ত্রী আয়শাসহ ছয়জনকে ফাঁসির আদেশ দেন আদালত। বরগুনার আদালত রায় ঘোষণার পর ছয়জনকে চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী তাদের কারাগারের কনডেম সেলে নেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারা অধিদপ্তরের একজন সহকারী মহাপরিদর্শক বলেন, দেশের ৬৮টি কারাগারে এখন মোট বন্দি আছেন ৮০ হাজার ২১৭ জন। এদের মধ্যে ৬৪ হাজার ৫৮০ জন হাজতি আর ১৫ হাজার ৬৩৭ জন কয়েদি। “ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যা ১ হাজার ৮৯৮ জন। এদের মধ্যে পুরুষ ১৮৫০ আর নারী ৪৮ জন। বরগুনার আয়শা আক্তার মিন্নিসহ ছয় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির হিসাব এখানে যোগ হয়নি।” অটোমেশন সিস্টেম না থাকায় রোববার তাদের নাম তালিকায় যুক্ত হবে বলে জানান তিনি।

কারা অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজনস) তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ফাঁসির আদেশপ্রাপ্ত ৪৯ জন নারী দেশের বিভিন্ন কারাগারের কনডেম সেলে আছেন। তবে দেশে এখন পর্যন্ত কোনো নারীর ফাঁসি কার্যকর হয়নি।

# মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের যে বিশেষ সেলে রাখা হয়, সেটিই কনডেম সেল
# দেশের ৬৮ কারাগারে মোট ১৯০৪ জন বন্দী কনডেম সেলে
# কনডেম সেলের বন্দীদের জন্য আচরণবিধিও ভিন্ন

কনডেম সেল কী?

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের কারাগারের যে বিশেষ সেলে রাখা হয়, সেটিই কনডেম সেল। কারাগারে থাকা অন্য বন্দীদের তুলনায় কনডেম সেলের বন্দীদের জন্য ভিন্ন আচরণবিধি রয়েছে। অন্য বন্দীদের থাকার জায়গার সঙ্গেও কনডেম সেলের বেশ পার্থক্য আছে।

সাবেক কারা উপমহাপরিদর্শক শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশের জেল কোড বা কারাবিধিতে ফাঁসির আসামিদের কনডেম সেলে রাখার মতো কোনো বিষয় উল্লেখ না থাকলেও তাঁদের আলাদা ধরনের কক্ষে রাখা হয়। এটিকে একধরনের রেওয়াজ বলা যেতে পারে। একটি কনডেম সেলে সাধারণত একজন বা তিনজন বন্দী রাখা হয়। তিনি বলেন, সাধারণত ধারণা করা হয়, কনডেম সেলে দুজন বন্দী থাকলে তাঁরা কারাগার থেকে গোপনে পালানোর পরিকল্পনা করতে পারেন। তবে তিনজন থাকলে পরিকল্পনা আর গোপন থাকে না। ওই ধারণা থেকেই দুজন বন্দীকে একটি কনডেম সেলে রাখা হয় না।

শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বলেন, কনডেম সেলের ভেতরে আলো-বাতাস চলাচলের জন্য ছোট আকারের জানালা থাকে। আর এই সেলে থাকা বন্দীদের দিনে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেলের বাইরে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়। কারাবিধি অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার পর একজন বন্দীকে কারাগারে সার্বক্ষণিক পাহারায় রাখা, দর্শনার্থীদের সঙ্গে দেখা করার বিষয়ে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হলেও আলাদা কক্ষে রাখার বিষয়টি আইনে নির্দিষ্ট করে উল্লেখ নেই। একজন বন্দী থাকার কনডেম সেল সাধারণত ১০ ফুট বাই ৬ ফুট আয়তনের থাকে। আবার অনেক কারাগারে সেলের মাপ কিছুটা বড় থাকে। কনডেম সেলের মধ্যে বন্দীর থাকা-খাওয়া, গোসল ও টয়লেটের ব্যবস্থা রয়েছে।

শামসুল হায়দার আরও বলেন, আগে কনডেম সেলের বন্দীদের নিজেদের সেলের বাইরে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল না। সেল থেকে বছরের পর বছর বের হননি, এমন উদাহরণও আছে। কিন্তু একটি ছোট ঘরের ভেতরে দীর্ঘ সময় থাকতে থাকতে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তাই বর্তমানে কনডেম সেলের বন্দীদের দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় বাইরে চলাফেরা করতে দেওয়া হয়। কনডেম সেলে থাকা বন্দীরা মাসে এক দিন দর্শনার্থীদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান। বিশেষ বিবেচনায় কখনো কখনো ১৫ দিনের মধ্যেও কনডেম সেলের আসামির সঙ্গে দর্শনার্থীদের দেখা করতে দেওয়া হয়।

শামসুল হায়দার বলেন, যত দিন পর্যন্ত উচ্চ আদালত মৃত্যুদণ্ডের আদেশ বাতিল না করছে, তত দিন পর্যন্ত বন্দীকে কনডেম সেলেই থাকতে হয়। কারাবিধি অনুসরণ করে কনডেম সেল থেকে গিয়েই আদালতের কার্যক্রমে যোগ দিতে হয় বন্দীকে।

কারা সূত্র জানায়, সাধারণ দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা এক কক্ষে অনেকে থাকেন, কক্ষের বাইরে ঘোরাফেরার সময়ও বেশি পান। তাঁদের খাবারের জন্য ডাইনিংয়ে যাওয়া, গোসলের জন্য আলাদা জায়গা রয়েছে। দর্শনার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার ক্ষেত্রে সাধারণ বন্দীরা বেশি ছাড় পান।

প্রসঙ্গত, ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় করা মামলার রায়ে মূল হোতা অধ্যক্ষ সিরাজসহ ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলো- সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা, ফাজিল শ্রেণির শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন শামীম, নুর উদ্দিন, মাদরাসা পরিচালনা কমিটির সাবেক সহসভাপতি ও সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সদ্য বিদায়ী সভাপতি রুহুল আমিন, মাদরাসার ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক আবসার উদ্দিন, সোনাগাজী পৌর কাউন্সিলর মকসুদ আলম, মাদরাসার বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থী হাফেজ আব্দুল কাদের, উম্মে সুলতানা পপি, কামরুন নাহার মনি, ইফতেখার উদ্দিন রানা, এমরান হোসেন মামুন, মহিউদ্দিন শাকিল, মো. শরিফ, আবদুর রহিম শরিফ, সাইফুর রহমান জোবায়ের ও জাবেদ হোসেন।

Sharing is caring!