অনলাইন ডেস্ক->>

নারীদের সুরক্ষায় যে আইন তৈরি হয় ভারতে, তাতে অবহেলিত থাকে পুরুষের স্বার্থ৷ অথচ পুরুষরাও একইরকম নিগ্রহ, অপমানের শিকার৷ বলছে ‘‌অল বেঙ্গল মেন’স ফোরাম’‌৷পুরুষদেরও উচিত থানায় গিয়ে ‘‌বিবাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাস’ অভিযোগ করা৷ প্রথমে হয়ত পুলিশ হাসবে৷ নেবে না অভিযোগ৷ তার পর হয়ত এটাই দস্তুর হবে৷ কারণ মেয়েরাই সবচেয়ে বেশি বাড়ির চাপের কথা, পরিবার বা বাবা–মায়ের সেন্টিমেন্টের অজুহাত দিয়ে সম্পর্ক থেকে পিছিয়ে আসে৷ উঁচু সরকারি পদে চাকরি করা, বা বিদেশে থাকা পাত্রকে বিয়ে করে নয়৷ সোশাল মিডিয়াতেও দেখা যায় মেয়েদের হা হুতাশ৷ সংসার করতে গিয়ে কারও গান হয়নি, কারও লেখা হয়নি, কেউ অভিনয় করতে পারেনি৷ কিন্তু ছেলেরাও যে সংসার করতে গিয়ে কত স্যাক্রিফাইস করে, তার হিসেব কে রাখে!‌

— এতটাই জোরদার ‘‌অল বেঙ্গল মেন’স ফোরাম’–এর পরিচালিকা নন্দিনী ভট্টাচার্যের বক্তব্য৷ পুরুষবিরোধী দেশ, আইন ও সমাজের বিরুদ্ধে যিনি আন্দোলন গড়ে তুলতে চান৷ মনে করেন, নারী সুরক্ষার নামে পুরুষের স্বার্থ, সুরক্ষা ভারতে অবহেলিত হয়, যা অন্যায়৷

ঠিক কোন ঘটনা থেকে এমন ভাবনায় পৌঁছেছিলেন নন্দিনীদেবী? না, নির্দিষ্ট একটি ঘটনা নয়৷‌ জানালেন, ‘‌‘‌আমি যখন থেকে কলেজে পড়ি, আমার এটা খুব মনে হয়েছে৷ আমি কোনওদিনই মেয়েদের পক্ষে কথা বলতে খুব আগ্রহী ছিলাম না৷ আমার সবসময়ই মনে হয়, ছেলেরা না, (‌আর)‌ একটি ছেলের কথা খুব একটা বলেন না৷ যেটাকে বলে ‘‌ব্রুড’ করা, সেটাও করেন না৷ বা নিজেদের কথা এগিয়ে এসে বলা.‌.‌.‌এটা বলতে পারেন আমি আমার বাবাকে যদি বাড়িতে দেখি, বা সবাইকেই, বলেন না৷ আমি খুব কষ্ট করেছি, বা আমি খুব স্যাক্রিফাইস করেছি— বলেন না৷ একটা ছোট উদাহরণ দিই৷

আজ সকালে আমি খবর দেখছিলাম৷ তাতে বলছেন, পূর্ব মেদিনীপুরের একটি কোভিড হাসপাতালের নার্সরা বলছেন, আমরা মেয়েরা সংসার ছেড়ে পড়ে থেকেছি তিন মাস৷ আরে, পুরুষ ডাক্তাররা, তাঁদের সংসার নেই!‌ ওয়ার্ডবয়ও আছেন, মেল নার্সরাও আছেন, তাঁদের সংসার নেই! মানে, সংসার ব্যাপারটা শুধু মেয়েদের!‌’’শুধু এই ক্ষেত্রেই নেই, নন্দিনী ভট্টাচার্য এরকম আরও একাধিক প্রসঙ্গে সমাজের যে প্রচলিত একপেশে ধারণা, তার উদাহরণ দিয়েছেন৷ যেমন, কোনও দম্পতি অকালে সন্তানহারা হলে সবসময় বলা হয় মায়ের কোল খালি হল৷ কিন্তু কেন?‌বাবার বুকও কি খালি হয়ে যায় না?‌সেকথা কেন কখনও বলা হয় না, ভাবা হয় না?‌প্রশ্ন তুলেছেন তিনি৷ এর পাশাপাশি আরও জরুরি একটি বৈষম্যের দিকে তিনি নির্দেশ করেছেন৷ যে দেশের সব আইন মেয়েদের পক্ষে, কিন্তু ছেলেদের সমর্থনে একটি আইনও নেই৷ বধূ নির্যাতন, গার্হস্থ্য সন্ত্রাস প্রতিরোধে আইন থেকে শুরু করে শিশুদের যৌন হেনস্থার প্রতিকারে আইন, সর্বত্রই অভিযোগের আঙুল ছেলেদের দিকে৷

কিন্তু যদি তুলনা করা হয়, তা হলে মেয়েদের বিরুদ্ধে অপরাধের সংখ্যা ছেলেদের বিরুদ্ধে ঘটা অপরাধের থেকে অনেক বেশি৷ সেক্ষেত্রে আইনের সাহায্য বা সমর্থন কি মেয়েদেরই বেশি জরুরি নয়?‌এই প্রশ্নের উত্তরে পরিসংখ্যান দিলেন নন্দিনী ভট্টাচার্য, যে ‘‌‘‌ভারতবর্ষে প্রত্যেক বছর মেট্রিমনিয়াল ডিসপিউটে ৯৮ হাজার পুরুষমানুষ আত্মহত্যা করেন৷ মেয়েরা ৩১,০০০৷ এই ৩১ হাজারটা কীসে?‌ডাউরি সংক্রান্ত৷ এবার পণ নেওয়া এবং দেওয়া, দুইই তো অপরাধ৷ আমি তো এরকম মেয়েদের জানি, বাপের প্রভিডেন্ট ফান্ড শেষ করে দিয়েছে৷ (‌বাবা)‌ বাড়ি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন৷ কেন?‌দিদিকে এত কিছু দিয়েছ, আমায় কেন দেবে না?‌আমি কী করে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে মুখ দেখাব!‌আমাকে দিতেই হবে৷ বাবাকে সবকিছু দিতে বাধ্য করেছে সেই মেয়েরা৷ তারা কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাবা–মাকে দেখে না৷ আমি কোথাও কিন্তু বলছি না নারী নির্যাতিত নন৷ প্রচুর নারী এখনও নির্যাতিতা৷ ল এবং জাস্টিস কিন্তু এক জিনিস নয়৷ আইন হলেই কিন্তু জাস্টিস হয় না৷ বহু নারী এখনও জানেন না, কাকে থানা বলে৷ কিন্তু পুরুষ মানুষও নির্যাতিত৷ পুরুষ মানুষেরও ১৮% রেপড হয়!‌’’

এই অন্যায়ের প্রতিকারের জন্যে, পুরুষদের হয়ে আওয়াজ তুলতে ‘‌অল বেঙ্গল মেন’স ফোরাম’‌তৈরি করেছেন নন্দিনীরা৷ তার হেল্প লাইনে ফোন করলে অভিযোগের সারবত্তা এবং গুরুত্ব যাচাই করে মানসিক সাহায্য থেকে আইনি পরামর্শ, সবই দেওয়া হয়৷ মাসিক চাঁদার বিনিময়ে যাঁরা সদস্যপদ নেন, তাঁদের নিয়ে ফুটবল দল, বৃন্দগানের দলও খোলা হয়েছে, যাতে তাঁরা মানসিকভাবে উজ্জীবিত থাকেন৷ আর দেশের আইন প্রণেতাদের কাছে তাঁদের প্রাথমিক দাবি, নারী সুরক্ষায় আইন তৈরির সময় পুরুষদের কথা শোনার জন্যও কেউ থাকুন৷ আইন যাতে একপেশে না হয়ে যায়৷ পুরুষরাও যাতে নারীদের সমান মর্যাদা এবং স্বীকৃতি পান৷

সূত্রঃ ডয়চে ভেলে

Sharing is caring!