আব্দুল কাইয়ুম->>

প্রথম দিকে বিজ্ঞানীরা বলতেন, করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে। সময় লাগবে। কারণ কোনো দেশ বা অঞ্চলের মানুষের অন্তত ৭০ শতাংশ করোনাভাইরাস-প্রতিরোধী হতে হবে। সেটা কিছুটা হবে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দেহে সৃষ্ট অ্যান্টিবডির সক্রিয়তায় সুস্থ হওয়ার মাধ্যমে, আর বাকিটা হতে হবে টিকার (ভ্যাকসিন) মাধ্যমে। যেহেতু টিকা আবিষ্কারে কয়েক বছর দরকার, তাই করোনা মহামারি দূর হতে সময় লাগবে। কিন্তু সম্প্রতি বেশ কিছু গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখছেন, ৭০ শতাংশ নয়, ৫০ শতাংশ বা ক্ষেত্র বিশেষে এর কম রোগপ্রতিরোধী হলেই সেই অঞ্চল ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জন করতে পারে। অর্থাৎ ওই এলাকায় করোনাভাইরাস তার বংশ বিস্তারের জন্য প্রয়োজনীয় আশ্রয় আর পাবে না। রোগটি সেখানে বিলুপ্ত হবে।

বিজ্ঞানীরা এখন এটাও বলছেন, যাঁদের করোনার সামান্য লক্ষণ দেখা গেছে এবং দ্রুতই সুস্থ হয়ে উঠেছেন, তাঁদের শরীরেও এমন অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, যা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সক্রিয় থাকে। এসব বিষয়ে ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকায় (অনলাইন) ১৬ ও ১৭ আগস্ট দুটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা ছাপা হয়েছে।

প্রথমে আমরা দেখব হার্ড ইমিউনিটি কীভাবে অর্জিত হতে পারে। এখানে মূলত হিসাব করা হয় ভাইরাসটির পুনরুৎপাদন সংখ্যা (রিপ্রোডাকটিভ নাম্বার, আরও) দিয়ে। সহজ ভাষায় বলা যায় একজন আক্রান্ত ব্যক্তি কত জনের মধ্যে ভাইরাসটি ছড়ান, সেই সংখ্যা দিয়ে। এখানে একটি বাস্তবতা বিবেচনায় রাখতে হবে। সব দেশেই গ্রাম ও শহরের জনবসতির ঘনত্বে পার্থক্য থাকে। হয়তো নগরের প্রাণকেন্দ্রে জনঘনত্ব বেশি, সেখানে মানুষের মধ্যে যোগাযোগ, কথাবার্তা বেশি। কর্মচাঞ্চল্য বেশি। ফলে এসব জায়গায় ভাইরাস বিস্তারের অনুপাত বেশি। কিন্তু আবার গ্রাম বা শহরের প্রান্তিক এলাকায় জনবসতি বিরল। সেখানে ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা কম। এই বিভাজন হিসাবে নিয়ে নতুন গাণিতিক মডেলে দেখা গেছে, অ্যান্টিবডি-সম্পন্ন জনসংখ্যার অনুপাত কম থাকলেও কোনো কোনো এলাকা হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করেছে বলে ধরে নেওয়া যায়। আর যদি তা-ই হয়, তাহলে একেকটা দেশে হয়তো তুলনামূলক কম সময়ে করোনা বিদায় নিতে পারে।

অবশ্য অনেক বিজ্ঞানী বলছেন, এই হিসাব একেবারে নিশ্চিত ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। কারণ, জনবিরল এলাকায় দু-চারজন ব্যক্তি আক্রান্ত হলে সেখানে দ্রুত রোগ ছড়িয়ে যেতে পারে। তাই সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। এবং আশঙ্কা থাকুক বা না থাকুক, মাস্ক পরে বাইরে চলাফেরা করার অভ্যাস সবার জন্যই দরকার। হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের পরও এই অভ্যাস অনেক দিন চালিয়ে যেতে হবে।

অ্যান্টিবডি কত দিন সক্রিয় থাকে

শরীরের রোগপ্রতিরোধী অ্যান্টিবডি সব ধরনের ভাইরাস বা জীবাণুর বৈশিষ্ট্যগুলো স্মৃতিতে একই মাত্রায় ধারণ করে রাখে না। কিন্তু বিজ্ঞানীরা দেখছেন, বিশেষভাবে করোনাভাইরাসকে শরীরের অ্যান্টিবডি অনেক দিন মনে রাখে। এমনকি কয়েক মাস পর যদিও নিষ্ক্রিয় হয়, তা-ও সুপ্ত অবস্থায় থেকে যায় এবং প্রয়োজনে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ধরা যাক, কোনো ব্যক্তি সামান্য লক্ষণ নিয়ে করোনায় আক্রান্ত হলেন। সুস্থ হয়ে ওঠার পর তাঁর শরীরে যে রোগপ্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, সেই সঙ্গে রোগপ্রতিরোধী বি এবং টি-সেলগুলো বেশ কয়েক মাস পরও করোনাভাইরাসকে চিহ্নিত করতে পারে এবং সহজে তাকে নিষ্ক্রিয় করে। এটা বলতে গেলে সাম্প্রতিক আবিষ্কার। উৎসাহিত হওয়ার মতো একটি সুসংবাদ। অবশ্য এই তথ্যটি এখনো বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নের পর্যায়ে রয়েছে।

এটা যদি সঠিক হয়, তাহলে বলা যায় কোনো কোনো দেশ হয়তো কম সময়ের মধ্যেই হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করতে পারে, এটা অসম্ভব নয়।

বাসায়ও সাবধানতা দরকার

আমরা সাধারণত মনে করি কেবল বাইরে গেলেই সংক্রমণের আশঙ্কা বেশি, বাসায় তেমন নেই। এটা অনেকাংশে সঠিক। কিন্তু মনে রাখতে হবে, বাসায় কেউ যদি আক্রান্ত হন, তাহলে তাঁর মাধ্যমে পরিবারের সবার আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাইরের পরিবেশের চেয়েও বেশি। পরিবারের অনেক সদস্যকেই বাইরে কাজে যেতে হয়। অফিসে একই ঘরে অনেকে কাজ করেন। বাসে চলাফেরা করতে হয়। সব সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা হয় না। তাই কাজ থেকে ফিরে পরিবারের অন্য সদস্যদের সংস্পর্শ এড়িয়ে প্রথমেই সাবান দিয়ে গোসল করা একান্ত দরকার। এবং তাঁর জামাকাপড়, মাস্ক সাবানপানিতে ধোয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

এই সাধারণ নিয়মগুলো মেনে চললে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক কমে যাবে। কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের অনেকেই এসব দিকে গুরুত্ব কম দিই। এটা উচিত নয়। কারণ, আমার অবহেলায় নিজে এবং সেই সঙ্গে পরিবারের সবাই করোনায় আক্রান্ত হোক, এটা নিশ্চয়ই কেউ চাই না।

# আব্দুল কাইয়ুম, মাসিক ম্যাগাজিন বিজ্ঞানচিন্তার সম্পাদক

Sharing is caring!