বিশেষ প্রতিবেদক->>

সোনাগাজী ও সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্যে ২০১৩ সালে নির্মাণ করা হয় মঙ্গলকান্দি ২০ শয্যার হাসপাতাল। তবে এক দশক পার হলেও চালু হয়নি এটি। নির্মাণের পর থেকে অব্যবহৃত থাকায় কিছু অবকাঠামো, আসবাব ও যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটিতে একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, একজন উপসহকারী কমিউনিটি ক্লিনিক কর্মকর্তা ও একজন পিয়ন ডেপুটেশনে কর্মরত। তারা আউটডোরে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে ফেনী সিভিল সার্জন ডা. সিহাব উদ্দিন বলেন, ‘২০ শয্যার মঙ্গলকান্দি হাসপতালটি চালুর জন্য বারবার দপ্তরে চিঠি দেয়া হয়েছে। নানা চেষ্টা-তদবিরের পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হাসপাতালটি পরিদর্শন করে গেছে। তার পরও জনবল পদায়ন করা হচ্ছে না। এ অবস্থায় তিনজনকে সেখানে ডেপুটেশনে দিয়ে বহির্বিভাগ চালু রাখা হয়েছে। তবে যারা সেখানে দায়িত্ব নিয়ে অনুপস্থিত থাকেন; তাদের কারণ দর্শানো হবে। এ বিষয়ে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।’

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে মির্জাপুরে ফেনী-সোনাগাজী সড়কের পূর্ব পাশে তিন একর জমিতে ২০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের ঘোষণা দেয়া হয়। একই বছরের ১৮ আগস্ট দরপত্র আহ্বান করা হলে চট্টগ্রামের ‘মেসার্স রয়াল অ্যাসোসিয়েট অ্যান্ড দেশ উন্নয়ন লিমিডেট’ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পায়। ৫ কোটি ৯২ লাখ ৮৮৭ টাকায় সেখানে নির্মাণ হয় হাসপাতাল ভবন, ডরমিটরিসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। ২০১৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাসপাতাল ভবন স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হস্তান্তর করে। সেই থেকে ১০ বছর পার হলেও হাসপাতালটি চালু হয়নি। হাসপাতালটি চালু হলে সোনাগাজী উপজেলার মঙ্গলকান্দি, চর মজলিশপুর, বগাদানা, নবাবপুর ও চরদবেশসহ ফেনী সদর উপজেলার ধলিয়া ইউনিয়নের দুই লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা সহজ হয়ে উঠত। হাসপাতালটি চালু না হওয়ায় নিরুপায় হয়ে এখনো তাদের সোনাগাজী অথবা ফেনী জেলা শহরে রোগী নিয়ে ছুটতে হয়।

সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. উৎপল দাশ বলেন, ‘২০ শয্যার হাসপাতালটি চালুর জন্য বারবার চিঠি দেয়া হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। এটি চালু করতে না পারলেও সেখানে বহির্বিভাগ খোলা রাখা হয়েছে। বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটিতে একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, একজন উপসহকারী কমিউনিটি ক্লিনিক কর্মকর্তা ও একজন পিয়ন ডেপুটেশনে কর্মরত।’

এদিকে দীর্ঘ ১০ বছরেও হাসপাতাল চালু করতে না পারায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। তাদের দাবি, সংসদ সদস্যের সঙ্গে এখানকার জনসাধারণের তেমন কোনো সম্পর্ক নেই; তার সঙ্গে মানুষ সুখ-দুঃখ ভাগ করার সুযোগ পায় না। তাই তিনি নাগরিক সুবিধা-অসুবিধা জানতে পারছেন না। এ বিষয়ে চেষ্টাও করছেন না। আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানও এ বিষয়ে তেমন সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন না। জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয় না থাকায় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত চালু করা যায়নি।

তবে ফেনী-৩ আসনের সংসদ সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘হাসপাতালটি আমার উদ্যোগেই মঙ্গলকান্দিতে নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণ শেষে জনবল পদায়ন না করায় এটি চালু করা যাচ্ছে না। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয়। জনবল অনুমোদনের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হয়েছে। জনবল অনুমোদন, যন্ত্রপাতি স্থাপন ও প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে এখানে শয্যা চালু করা হবে।’

সরজমিন দেখা গেছে, ফেনী-সোনাগাজী সড়কের পাশে নির্মাণ করা হয়েছে হাসপাতালের প্রধান ফটক। তার পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে হাসপাতালের চিকিৎসক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য চারটি আবাসিক ভবন। হাসপাতালটিতে জনবল পদায়ন না হওয়ায় বৃহদায়তনের চিকিৎসক ডরমিটরিতে থাকেন মাত্র একজন চিকিৎসক। নার্স ডরমিটরিতে থাকেন দুই-তিনজন। নির্মাণের পর থেকে তালাবদ্ধ রয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মাণ করা আরো দুটি আবাসিক ভবন। ব্যবহার না হওয়ায় ভবনগুলোর দরজা, জানালা এবং জানালার কাঁচ ভেঙে পড়েছে অনেক আগে। অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনগুলো। একই অবস্থায় পড়ে আছে হাসপাতালের গার্ড রুম, গ্যারেজ ও অন্যান্য স্থাপনা।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা উৎপল দাশ বলেন, ‘হাসপাতালে দায়িত্বরত চিকিৎসক উপজেলা হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করার প্রশ্নই ওঠে না। সেখানে কর্মরত মেডিকেল অফিসার আমার কাছে ছুটির আবেদন করেননি, আমি ছুটিও দিইনি। কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’