নিজস্ব প্রতিবেদক->>
ফেনীতে ২০১৯ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১২৯টি মামলায় ২২২ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ধর্ষণ, যৌন হয়রানী, অপহরণ, নারী নির্যাতন, যৌতুকসহ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১২৯টি মামলায় আসামী করা হয়েছিলো ৩০৫ জন।
পুলিশ প্রশসন ও আদালত সূত্র জানায়, ফেনীর ছয়টি থানার ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ণের ৬৪ মামলা হয়েছিলো। এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনায় ৩৭টি ও যৌন নিপীড়নে ২৬টি মামলা হয়েছে। জেলায় নারী ও শিশু অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ৩৭টি। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৮টি। আর যৌতুকের জন্য খুনের মামলা হয়েছে
একটি।

জেলায় সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে দাগনভূঞা ও সোনাগাজী থানায়। ৯টি করে মামলা হয়েছে এই দুটি থানায়। এ ছাড়া ফেনী সদর থানায় ৭টি, ছাগলনাইয়ায় ৬টি, পরশুরাম থানায় ৪টি এবং ফুলগাজী থানায় ২টি মামলা হয়েছে।
গত এক বছরে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় জেলার ছাগলনাইয়া থানায় ৬টি, ফেনী সদর থানায় ৫টি, সোনাগাজী থানায় ৫টি, দাগনভূঞা থানায় ৪টি, পরশুরাম থানায় ৩টি এবং ফুলগাজী থানায় ৩টি মামলা হয়েছে।
গত এক বছরে নারী নির্যাতন ও যৌতুকের ঘটনায় জেলার ফুলগাজী থানায় ৮টি, ফেনী সদর থানায় ৬টি, দাগনভূঞা থানায় ৪টি, সোনাগাজী থানায় ৪টি, ছাগলনাইয়া থানায় ৪টি এবং পরশুরাম থানায় ২টি মামলা হয়েছে।

জেলার অপহরণের ঘটনায় ফেনী সদর থানায় ১৪টি, ছাগলনাইয়া থানায় ৭টি, সোনাগাজী থানায় ৬টি, ফুলগাজী থানায় ৪টি, পরশুরাম থানায় ৩টি এবং দাগনভূঞা থানায় ৩টি মামলা হয়েছে। ঘটনার শিকার সব ব্যক্তিকে পরে উদ্ধার করা হয়েছে।
গত এক বছরে যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণ ছাড়াও জেলায় নারী ও শিশু নিখোঁজের ঘটনায় বিভিন্ন থানায় ১৫টি জিডি করা হয়েছে।
২০১৯ সালে ফেনী জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মোট ১২৯টি মামলা হয়েছে। যা ২০১৮ সালের তুলনায় কমেছে। ২০১৮ সালে জেলায় মামলার সংখ্যা ছিল ১৭৬টি। আর ২০১৭ সালে ছিল ১২৪টি।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার’র ফেনীর ফোকাল পার্সন নাজমুল হক শামীম বলেন, সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক ও রুচিবোধের অধঃপতন, আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব এবং মুঠোফোনে অবাধ পর্নোগ্রাফির বিস্তারসহ বিভিন্ন কারণে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা বেড়ে চলছে। সামাজিক লোক-লজ্জার ভয়ে অনেক ঘটনা থানা কিংবা আদালত পর্যন্ত গড়ায় না। সব ঘটনায় মামলা হলে এ সংখ্যা অনেক বেশি হতো।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ফেনী জেলা সভাপতি ও বিশিষ্ট আইনজীবী লক্ষণ বনিক বলেন, সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে ধর্ষণ ও যৌণ হয়রানী বেড়েছে। অনেক পরিবার আত্মসম্মানের কথা বিবেচনা করে এসব ঘটনা প্রকাশ বা থানায় মামলা করা থেকে বিরত থাকেন।
বাংলাদেশ মানবাধিকার সম্মিলন ফেনীর চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ধর্ষণের সব ঘটনায় থানায় মামলা হয় না। সামাজিক ও পারিবারিক কারণে অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না। তাঁর মতে, জেলায় যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনা আরও বেশি হবে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হলে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
ফেনী পুলিশ সুপার খোন্দকার নুরুন্নবী জানান, ফেনীতে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় থানায় মামলা, জিডিসহ অভিযোগ পেলেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে তৎপর হন।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সারা দেশে ১ হাজার ৭০৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৩৭ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৭৭ জনকে। ধর্ষণের ঘটনায় আত্মহত্যা করেছেন ১৯ জন। ২৪৫ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়।

প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালে সারাদেশে আলোচিত ছিল ফেনীর মাদ্রাসা শিক্ষার্থী নুসরাত হত্যা। সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন ছাত্রী নুসরাত জাহান। এ ঘটনায় তাঁর মা শিরিনা আক্তার বাদী হয়ে মামলা করলে গ্রেপ্তার হন অধ্যক্ষ। মামলা তুলে না নেওয়ায় গত ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার প্রশাসনিক ভবনের ছাদে নুসরাতের শরীরে আগুন লাগিয়ে দেন দুর্বৃত্তরা। ১০ এপ্রিল তাঁর মৃত্যু হয়, যা দেশব্যাপী আলোড়ন তোলে।

Sharing is caring!