ডেক্স রিপোর্ট->>

দুর্নীতি-অনিয়ম-অবিচার-হত্যা মামলার সাজায় এ বছর ব্যস্ত ছিল আদালতপাড়া। ২০১৯ সালে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিল ফেনীর নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলা, জোড়া খুনের মামলায় এমপিপুত্র রনির যাবজ্জীবন, গুলশানের হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলা মামলা, আইনজীবীর সহকারী মোবারক হোসেন ভূঁইয়া হত্যা মামলার রায় এবং স্কুলশিক্ষার্থী রাজীব-দিয়াকে জাবালে নূর বাসের চাপায় হত্যা মামলার রায়সহ আরও বেশ কয়েকটি আলোচিত মামলার রায়।
জোড়া খুনের মামলায় এমপিপুত্র রনির যাবজ্জীবন :

রাজধানীর ইস্কাটনে বহুল আলোচিত জোড়া খুনের মামলায় একমাত্র আসামি আওয়ামী লীগের নেত্রী ও সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বেগম পিনু খানের ছেলে বখতিয়ার আলম রনিকে ৩০ জানুয়ারি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত। তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে আদালত ওই রায় দেন।

২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল গভীর রাতে নিউ ইস্কাটনে মদ্যপ অবস্থায় রনি নিজ গাড়ি থেকে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়েন। এতে রিকশাচালক হাকিম ও অটোরিকশাচালক ইয়াকুব আলী আহত হন। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই বছরের ১৫ এপ্রিল হাকিম এবং ২৩ এপ্রিল ইয়াকুব মারা যান। এ ঘটনায় হাকিমের মা মনোয়ারা বেগম অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকে আসামি করে রমনা থানায় মামলা করেন।

সেই বছরই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ২৪ মে মামলার দায়িত্ব পাওয়ার পর ৩১ মে এলিফ্যান্ট রোডের বাসা থেকে রনিকে গ্রেফতার করে। পরে ২১ জুলাই রনিকে একমাত্র আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপ-পরিদর্শক (এসআই) দীপক কুমার দাস।

২০১৬ সালের ৬ মার্চ রনির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ সামছুন নাহার। কয়েক বছরের বিচার প্রক্রিয়ার পর ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মঞ্জুরুল ঈমাম রায় ঘোষণা করেন।

রিশা হত্যায় ওবায়দুলের মৃত্যুদণ্ড :
রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিশাকে (১৪) ছুরিকাঘাতে হত্যা মামলার আসামি ওবায়দুলকে গত ১০ অক্টোবর মৃত্যুদণ্ড দেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত। পাশাপাশি ওবায়দুলের ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডও হয়।

২০১৬ সালের শুরুর দিকে রিশা ও তার মা তানিয়া ইস্টার্ন মল্লিকা মার্কেটে বৈশাখী টেইলার্সে কাপড় সেলাই করাতে যান। এ সময় তার মা ওই দোকানের রসিদের রিসিভ কপিতে ফোন নম্বর দিয়ে আসেন। ওই টেইলার্সের কর্মচারী ওবায়দুল রিসিভ কপি থেকে ফোন নম্বর নিয়ে রিশাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে বিরক্ত করতো। রিশার মা এ বিষয়ে ওবায়দুলকে সতর্ক করেন।

ওই বছরের ২৪ আগস্ট বন্ধু মুনতারিফ রহমান রাফির সঙ্গে রিশা পরীক্ষা শেষে কাকরাইল ওভারব্রিজ পার হওয়ার সময় তাকে আবারও প্রেমের প্রস্তাব দেয় ওবায়দুল। রিশা তা প্রত্যাখ্যান করলে ওবায়দুল তাকে ছুরিকাঘাত করে। রক্তাক্ত অবস্থায় রিশাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৮ আগস্ট মারা যায় রিশা।

আইনজীবীর সহকারী মোবারক হোসেন ভূঁইয়া হত্যায় ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড :
ঢাকার জজকোর্টের আইনজীবীর সহকারী মোবারক হোসেন ভূঁইয়া (৪৫) হত্যা মামলায় ২১ অক্টোবর ১২ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন ঢাকার ৩ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল।

দণ্ডিতরা হলেন : মো. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া ওরফে মহুব, মোজাম্মেল হক ভূঁইয়া ওরফে বাদল ভূঁইয়া, আফজাল ভূঁইয়া, এমদাদুল হক ওরফে সিকরিত ভূঁইয়া, নয়ন ভূঁইয়া, ভুলন ভূঁইয়া ওরফে ভুলু, রুহুল আমিন, শিপন মিয়া, সুলতানা আক্তার, দেলোয়ার হোসেন, বিধান সন্ন্যাসী ও নিলুফা আক্তার। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেয়া হয়।

মামলার অপর দুই পলাতক আসামি তাসলিমা আক্তার ও শামীম ওরফে ফয়সাল বিন রুহুলকে এক বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। জয়নাল আবেদীন নামে একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেয়া হয়।

মোবারক হোসেন কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর থানার গোথালিয়া ভূঁইয়া বাড়ীর মৃত ইশাদ ভূঁইয়ার ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা জজকোর্টে আইনজীবীর ক্লার্ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

মোবারক হোসেনের পরিবারের সঙ্গে জমিজমা নিয়ে আসামিদের বিরোধ ছিল। ওই বিরোধের জেরে ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবর এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠের পাশে মৃত্তিকা প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের ঘর নির্মাণকে কেন্দ্র করে আসামিরা মোবারক হোসেনের পেটে বল্লম দিয়ে আঘাত করে। এতে তার মৃত্যু হয়।

ফেনীর নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার রায় :
চলতি বছরের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের দায়ে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ৬ এপ্রিল ওই মাদরাসা কেন্দ্রের সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে অধ্যক্ষের সহযোগীরা নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান নুসরাত জাহান রাফি।

এ ঘটনায় মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে প্রধান আসামি করে আটজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও চার-পাঁচ জনকে আসামি করে নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ এপ্রিল সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন।

নুসরাত হত্যা মামলায় পুলিশ ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ ২১ জনকে বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেফতার করে। পরে ২৯ মে ১৬ জনকে আসামি করে ৮০৮ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দাখিল করে পিবিআই। সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় নূর হোসেন, আলাউদ্দিন, কেফায়েত উল্যাহ জনি, সাইদুল ও আরিফুল ইসলামের নাম অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেয়া হয়।

৩০ মে মামলাটি ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। ১০ জুন আদালত মামলাটি আমলে নিলে শুনানি শুরু হয়। ২০ জুন অভিযুক্ত ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন বিচারিক আদালত। ২৭ ও ৩০ জুন মামলার বাদী মাহমুদুল হাসান নোমানকে জেরার মধ্য দিয়ে বিচারকাজ শুরু হয়। এরপর ৯২ জন সাক্ষীর মধ্যে ৮৭ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন।

২৪ অক্টোবর নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ ১৬ আসামির ফাঁসির আদেশ দেন আদালত। একই সঙ্গে তাদের প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়।

নুসরাতের বক্তব্যের ভিডিও প্রকাশের দায়ে সাবেক ওসি মোয়াজ্জেমের কারাদণ্ড :
ফেনীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির বক্তব্য ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগে করা মামলায় ২৮ নভেম্বর সোনাগাজী মডেল থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনের ৮ বছরের কারাদণ্ড দেন বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনাল। কারাদণ্ডের পাশাপাশি ১৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের আদেশ দেন আদালত।

২৭ মার্চ নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়ন করেন মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলা। এমন অভিযোগ উঠলে দু’জনকে থানায় নিয়ে যান ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। এ সময় ওসি নিয়ম ভেঙে নুসরাতকে জেরা করেন এবং তার বর্ণনার ভিডিও ধারণ করেন। এ সময় সেখানে নুসরাত ছাড়া অন্য কোনো নারী বা তার আইনজীবী ছিলেন না।

এ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে ১৫ এপ্রিল মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে সাইবার ট্রাইব্যুনালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। তদন্ত শেষে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ২৭ মে মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার ২০ দিনের মাথায় ১৬ জুন হাইকোর্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন মোয়াজ্জেম।

বিচার প্রক্রিয়ার পর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের দুটি ধারায় সাবেক ওসি মোয়াজ্জেমের সাজা ঘোষণা করেন বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আস-শামস জগলুল হোসেন। দেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার প্রথম রায় ছিল এটি।

এমপি লিটন হত্যা মামলার রায় :
২৮ নভেম্বর গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন হত্যা মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য কাদের খানসহ ৭ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন আদালত। জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক দিলীপ কুমার রায় এ দণ্ডাদেশ দেন।

২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর সুন্দরগঞ্জের নিজ বাসভবনে গুলিতে নিহত হন গাইবান্ধা-এক আসনের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পর ২০১৭ সালের ৩০ এপ্রিল আদালতে চার্জশিট দেয় পুলিশ। অভিযোগপত্রে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ডা. আবদুল কাদের খানসহ আটজনকে আসামি করা হয়।

হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় সাতজনের মৃত্যুদণ্ড :
রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁয় বর্বরোচিত জঙ্গি হামলা মামলায় সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। পাশাপাশি তাদের ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেয়া হয়। ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান ২৭ নভেম্বর এ রায় ঘোষণা করেন। ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার বিচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।

এ মামলায় দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- জাহাঙ্গীর হোসেন, আসলাম হোসেন র‌্যাশ, মো. হাদিসুর রহমান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, মো. আব্দুল সবুর খান, শরিফুল ইসলাম খালেক ও মামুনুর রশীদ রিপন।

২০০৯ এর ৬ (২) (অ) ধারায় মৃত্যুদণ্ড হলেও ২০০৯ এর ৭ ধারায় প্রত্যেককে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও দুই বছর সশ্রম কারাদণ্ড; ২০০৯ এর ৮ ধারায় প্রত্যেককে ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড; ২০০৯ এর ৯ ধারায় পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। এ মামলার অপর আসামি মো. মিজানুর রহমানকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়।

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁয় হামলা চালিয়ে বিদেশি নাগরিকসহ ২০ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। তাদের গুলিতে দুই পুলিশ কর্মকর্তাও নিহত হন। পরে অভিযানে পাঁচ জঙ্গি নিহত হন। নিহত পাঁচ হামলাকারী হলেন- রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামেহ মোবাশ্বের, নিবরাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল।

ওই ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গুলশান থানায় মামলা করে পুলিশ। মামলা দায়েরের পর ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই আটজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) পরিদর্শক হুমায়ুন কবির। অন্যদিকে মামলা ও বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যেই বিভিন্ন ‘জঙ্গি আস্তানায়’ অভিযানে আটজন নিহত হন। তারা হলেন- তামিম আহমেদ চৌধুরী, নুরুল ইসলাম মারজান, তানভীর কাদেরী, মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম ওরফে মুরাদ, রায়হান কবির তারেক, সারোয়ান জাহান মানিক, বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট ও মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান।

রাজীব-দিয়াকে বাসচাপা দিয়ে হত্যার ঘটনায় জাবালে নূরের দুই চালকসহ তিনজনের যাবজ্জীবন :
রাজধানীর শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী আবদুল করিম রাজীব (১৭) ও দিয়া খানম মিম (১৬) জাবালে নূর পরিবহনের বাসের চাপায় প্রাণ হারানোর ঘটনায় ওই পরিবহনের দুই চালকসহ তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত। তাদের ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়। বিচার প্রক্রিয়ার পর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ ইমরুল কায়েশ ১ ডিসেম্বর এ রায় ঘোষণা করেন। দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- দুই চালক মাসুম বিল্লাহ, জুবায়ের সুমন এবং সহকারী কাজী আসাদ। তবে কাজী আসাদ পলাতক।

২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে জাবালে নূর পরিবহনের দুই বাসের রেষারেষিতে চাপা পড়ে নিহত হন শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম রাজীব ও একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম মিম। সেদিনই মিমের বাবা জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন।

২০১৮ সালের ২৫ অক্টোবর গঠিত অভিযোগপত্রে বলা হয়, ঘটনার দিন দুপুরে চালক ও তাদের সহকারীরা বেশি লোক ওঠানোর লোভে যাত্রীদের কথা না শুনে এবং তাদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করে জিল্লুর রহমান উড়াল সড়কের ঢালের সামনে রাস্তা ব্লক করে দাঁড়ান। এ সময় আরেকটি বাসের চালক মাসুম বিল্লাহ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ১৪-১৫ শিক্ষার্থীর ওপর গাড়িটি উঠিয়ে দেন। ঘটনাস্থলেই দুই শিক্ষার্থী নিহত হন। আহত হন নয়জন।

রাজীব-দিয়ার নির্মম মৃত্যুর প্রতিবাদে এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। পরে ঢাকাসহ সারাদেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। পরে সরকারের নানা আশ্বাসে সেই আন্দোলন থেকে সরেন শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল- বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে দুই শিক্ষার্থীকে হত্যাকারী চালকের ফাঁসি দিতে হবে, সড়কে ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে জাতীয় সংসদে সড়ক পরিবহন বিল-২০১৮ পাস হয়। এই আইনে ‘ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে’ প্রাণহানি ঘটালে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়। এছাড়া কোনো ব্যক্তির বেপরোয়া ও অবহেলাজনিত গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে এবং সেই দুর্ঘটনায় কেউ আহত বা নিহত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

এক বছর আগে নতুন সড়ক পরিবহন আইন পাস হলেও পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বাধার মুখে তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার। অবশেষে ২০১৯ সালের ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হয় ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’। যদিও আইনটি পুরোপুরি কার্যকরের আগেই দেশের বিভিন্ন স্থানে অঘোষিত পরিবহন ধর্মঘটের কারণে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

সূত্র : সময় টিভি

Sharing is caring!