শহর প্রতিনিধি->>
অনুমতি না থাকায় সংবাদ সম্মেলন করতে পারেনি ফেনী নদী পরিদর্শনে আসা ভাসানী অনুসারি পরিষদের বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষন টিম। বুধবার বিকালে শহরের একাডেমী এলাকায় একটি কমিউনিটি সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অদৃশ্য বাধায় পর্যবেক্ষক দলটি সংবাদ সম্মেলন করতে না পেরে ওই কমিউনিটি সেন্টারে সামনে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন পরিষদ নেতৃবৃন্দ।
এসময় প্রতিনিধি দলের সদস্য মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক মহাসচিব নঈম জাহাঙ্গীর, গণদলের চেয়ারম্যান ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কেন্দ্রীয় নেতা এ টি এম গোলাম মাওলা চৌধুরী, পানি বিশেষজ্ঞ ও জল পরিবেশ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ড. ম ইনামুল হক, ইউনূছ মৃধা, ফরিদ উদ্দিন, মোঃ ইসমাইল, কে. এম রকিবুল ইসলাম রিপন এবং ভাষানী অনুসারী পরিষদের ফেনী ও স্থানীয় সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন
২২ সদস্যের প্রতিনিধি দল ফেনী নদীর উৎসস্থল খাগড়াছড়ির আচালং- তাইন্দংয়ের বটতলী থেকে ফেনীতে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় করেন। প্রতিনিধি দলের সদস্যরা তাইন্দং ছড়া পরিদর্শন করেন। এসময় তারা স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তারা স্থানীয় বাঙ্গালী পাহাড়ীদের সঙ্গে ফেনী নদীর উৎস বিষয়ে চলমান বিতর্ক সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন।

পানি বিশেষজ্ঞ ও জল পরিবেশ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ড. ম ইনামুল হক বলেন, সরেজমিনে আমরা দেখেছি ফেনী নদী অবস্থানগত কারণে পানি ব্যবহারে দু’দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা অতিব জরুরি। তাই সম্পাদিত চুক্তি উত্তম পন্থা। কিন্তু প্রশ্ন হলো অবৈধ প্রক্রিয়ায় প্রতিদিন ৭০ কিউসেক পানি প্রত্যাহার নিয়ে আমাদের উদ্বেগ রয়েছে। পাশাপাশি তিস্তার হিস্যা যেখানে আমরা পাচ্ছি না সেখানে চুক্তির ১.৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার নিয়ে দেশবাসী উদ্বিগ্ন। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে বিজিবি মারফৎ জানা যায়, ভারত ৩৬টি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন পাম্পের মাধ্যমে ৭০ কিউসেকের বেশী পানি কোনরকম সমঝোতা ছাড়াই উত্তোলন করে যাচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশের মানুষ ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমাদের উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে বিজিবির মাধ্যমে জানা যায়, ভারত ৩৬টি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন পাম্পের মাধ্যমে ৭০ কিউসেকের বেশি পানি কোনরকম সমঝোতা ছাড়াই উত্তোলন করে যাচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশের মানুষ ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে তিস্তা পানি বন্টন চুক্তিসহ বাংলাদেশের আন্তজার্তিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার বিষয়টি মীমাংসা ছাড়াই ফেনী নদীর পানি ভারতে দেয়ার চুক্তিতে এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে বলে জানা গেছে ।
পরিষদের মহাসচিব শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশের জনগণের খাবার পানির জন্য সম্পাদিত চুক্তির বিপক্ষে বাংলাদেশের মানুষের অবস্থান নয়। কিন্তু ফেনী নদীর পানি যদি অন্য কাজে লাগানো হয়, অথবা বন্ধুদের স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে আমাদের হাজার হাজার জেলে, কৃষক অসহায় হয়ে পড়ে, তাহলে ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহার চুক্তিতে দেশিয় স্বার্থ সংরক্ষিত হয়নি বলে প্রতিয়মান হবে।

তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহার চুক্তি করেছে তা নিয়ে জনমনে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আমরা সেটি লক্ষ্য করে ভাসানী অনুসারী পরিষদ পানি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নিয়ে ফেনী নদীর উৎপত্তিস্থল পরিদর্শন করি এবং আমরা নিশ্চিত হয়েছি ফেনী নদী কোন আন্তর্জাতিক নদী নয়। এটি বাংলাদেশের নদী। কাজেই অমিমাংসিত ৫৪টি অভিন্ন নদীর হিস্যার ফয়সালা না হওয়া পযন্ত ফেনী নদীর পানি দেয়া আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক মহাসচিব নঈম জাহাঙ্গীর বলেন, গণবিরোধী একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যাচ্ছে, যা স্বাধীন দেশের মানুষ হিসেবে দুঃখজনক।
প্রতিনিধি দলের সদস্য গণদলের চেয়ারম্যান এটিএম গোলাম মাওলা চৌধুরী বলেন, বন্ধুপ্রতিম ভারতের জনগণের কষ্ট, প্রয়োজনীয়তা এবং মানবিক বিবেচনায় সম্পাদিত ফেনী নদীর পানি নেয়া চুক্তিকে অশ্রদ্ধাভরে দেখছি না। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাম্প দিয়ে পানি তুলে নেয়ার কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। কারণ চুক্তিতে যে পরিমান পানি তোলার কথা বলা হয়েছে, তার চেয়ে বেশি পানি অবৈধভাবে নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, এটি বন্ধ না হলে ফেনীর বিশাল একটি অংশ মরুভূমিতে পরিণত হবে। ব্যাহত হবে এখানকার কৃষি ও মৎস্য চাষ।

ফেনী নদীর উৎস পরিদর্শনে আসা ভাসানী অনুসারি পরিষদের বিশেষজ্ঞ দল সম্প্রতি সম্পাদিত সমঝোতা চুক্তি এবং অবৈধভাবে ৩৬ টি পাম্পের মাধ্যমে পানি উত্তোলন বিষয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের জন্য কর্মসূচি নির্ধারণ করে মঙ্গলবার। নদীর উৎসস্থল ফেনীছড়া, তাইন্দং ছড়া এবং আচালং ছড়ার মিলিতস্থান ফেনী নদী পরিদর্শনে গিয়ে পুলিশি বাধায় ফিরে আসে ভাসানি অনুসারি পরিষদ। এরপরই ফেনীতে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের কর্মসূচি ঠিক করা হয়। সে অনুযায়ী আজ সকালে বিশেষজ্ঞ টিম শুভপুর জগন্নাথ সোনাপুরের আমলীঘাট থেকে মহুরী প্রজেক্ট পর্যন্ত জলপথ পরিদর্শন করেন।

বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যরা জানান, ফেনী নদী থেকে চুক্তির অতিরিক্ত পানি প্রত্যাহারের বিরৃপ প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের পরিবেশের ওপর। ফেনী নদী পানির উপর মুহুরী, কহুয়া, কালিদাশ পাহালিয়া সহ অসংখ্য ছড়া ও খালের অস্বিত্ব নির্ভর করছে। শুষ্ক মওসুমে পানি প্রত্যাহার ও বর্ষাকালে ভারত একতরফা বাংলাদেশে পানি ছেড়ে দিয়ে কৃত্রিম বন্যা সৃষ্টিসহ নানা দূর্যোগের কারণে প্রতিবছর মুহুরী সেচ প্রকল্পের ইরি বোরো আবাদ আশঙ্কাজনক হারে কমছে। ফেনী নদী থেকে চুক্তির পানি বা চুক্তির অতিরিক্ত পানি ভারত প্রত্যাহার করে নিলে ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে শুস্ক মওসুমে ইরি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে গড়ে ওঠা দেশের ৬ষ্ঠ বৃহত্তম মুহুরী সেচ প্রকল্পের আওতায় ফেনী নদী, মহুরী-কহুয়া নদীর তীরবর্তী জমিতে শুস্ক মওসুমের আবাদ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভারত ফেনী নদীর পানি নিয়ে গেলে বন্ধ হয়ে যেতে পারে দেশের ৬ষ্ঠ মুহুরী সেচ প্রকল্প।

তারা আরো জানান, ফেনী নদীর পানির উপর চট্টগ্রাম ও ফেনী জেলার কয়েককোটি মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। তীরবর্তী কয়েক লাখ মানুষ ফেনী নদীর পানির উপর প্রত্যক্ষ ভাবে নির্ভরশীল। কয়েক হাজার জেলে পরিবারের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উৎস ফেনী নদী। পানির অভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে কয়েক লাখ মৎস খামার। ফেনী নদীর পানি ভারতকে দেয়ার কারণে সমগ্র অঞ্চলে দেখা দিতে পারে মরুময়তা, ধ্বংস হবে প্রকৃতি ও প্রতিবেশ-পরিবেশ। বন্ধ হয়ে যেতে পারে সাগর মোহনায় মুহুরী সেচ প্রকল্প এলাকার পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনার দ্বার। কারণ ফেনী নদীই মুহুরী নদীর ৮০ ভাগ পানির উৎস।
এসময় ভাসানী অনুসারী ফেনী জেলা সভাপতি এডভোকেট কাজী আহমেদ করিম সহ ভাষানী অনুসারী পরিষদের স্থানীয় সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

Sharing is caring!