নিজস্ব প্রতিবেদক->>

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আলকরা ইউনিয়নের পুঞ্জশ্রীপুর গ্রামে মুনির চৌধুরী নামের এক জামাত নেতার বাড়িতে যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট লুকিয়েছিলেন বলে জানিয়েছে র‌্যাব। ওই বাড়ি থেকে রোববার ভোরে র‌্যাব ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি সম্রাট ও সহ-সভাপতি এনামুল হক আরমানকে আটক করে।

র‌্যাব–১১ কুমিল্লা কোম্পানির ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার প্রণব কুমার বলেন, শনিবার সন্ধ্যা সাতটার পর থেকে র‌্যাবের ১২ থেকে ১৪টি গাড়ি পুঞ্জশ্রীপুর গ্রামের আশপাশে অবস্থান নেয়। র‌্যাব বিভিন্ন সড়কের মধ্যে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়।

স্থানীয় আলকরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান একেএম গোলাম ফারুক বলেন, যে বাড়ি থেকে সম্রাট র‌্যাবের হাতে ধরে পড়েছেন ওই বাড়িটি ফেনী পৌরসভার মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা স্টার লাইন পরিবহনের মালিক হাজি আলাউদ্দিনের ভগ্নিপতি ও স্টার লাইন পরিহনের পরিচালক চৌদ্দগ্রাম উপজেলার শিবিরের শীর্ষ ক্যাডার মনির চৌধুরীর।বাড়ির মালিক জামায়াত নেতা মনির চৌধুরী কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আলকরা ইউনিয়নের কুঞ্জুশ্রীপুর গ্রামের সোনা মিয়া চৌধুরীর ছেলে। তার দুলাভাই আলাউদ্দিন এক সময় জাতীয় পার্টি করলেও পরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে দল ত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন।

এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্য, আলকরা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ইসমাইল হোসেন বাচ্চু সম্রাট বাহিনীর সদস্য। তাঁর মাধ্যমেই সম্রাট জামায়াত নেতা মুনির চৌধুরীর বাড়িতে অবস্থান নেন। সেখান থেকে সীমান্ত পার হয়ে তাঁর ভারতে যাওয়ার কথা ছিল।

বাড়ির মালিক পরিবহন ব্যবসায়ী শিবির নেতা মনির চৌধুরীর বোন নাজু বেগম বলেন, ‘র‌্যাব যাদের ধরে নিয়ে যায় তারা তিনদিন আগে ওই বাড়িতে এসে দোতলার একটি কক্ষে অবস্থান নেয়। আমাদের জানানো হয় তারা বেড়াতে এসেছেন। সম্রাট যে ঘরে ছিলেন ওই ঘরের দরজার বাইরে সবসময় তালা লাগানো দেখা যেত। কিন্তু ভেতরে জ্বালিয়ে রাখা লাইটের আলো চোখে পড়তো। সেখানেই তাদের খাবার দেয়া হতো। তারা কখনও বাসার বাইরে বের হতো না। সন্ধ্যার আগে দুইজন মানুষ পুকুর পাড়ে গিয়ে বসে থাকতেন। মানুষের সামনে আসতেন না। বাড়িতে আর কোনও পুরুষ না থাকায় এ বিষয়ে তাদের জিজ্ঞাসা করা হতো না।’

নাজু বেগম আরও বলেন, তিন মাস আগে আমার ভাই এই বাড়িটি নির্মাণ করেন। অভিযানের সময় আমার ভাই মনির চৌধুরী বাসায় ছিলেন। পরে সম্রাট ও তার সহযোগীকে আটক করে নিয়ে যায় র‌্যাব। তবে মুনির চৌধুরী জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে এখন সক্রিয়ভাবে জড়িত নয় বলে দাবি করেন তিনি।

মনির চৌধুরীর ভাতিজি সামিয়া জান্নাত চৌধুরী ও তার মা নূর নাহার বলেন, ‘মনির চৌধুরী বাড়িতে থাকেন না। তিনি ফেনীতে থাকেন। তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে ঢাকায় থাকেন। বাড়িতে শুধু অসুস্থ মা থাকেন। মাকে দেখাশোনা করার জন্য বিবাহিত বোন স্বামীসহ থাকেন।

তারা আরও জানান, বাড়িতে সম্রাট আত্মগোপন করার পর মনির চৌধুরী বাড়িতে ঘন ঘন আসতেন। সঙ্গে তার শ্যালক ফেনীর পৌর মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা আলাউদ্দিনও আসতেন। সমাদর দেখে সামিয়া ও তার মা বুঝতেন সম্রাট ও তার সহযোগী মেহমান।

সামিয়া জান্নাত চৌধুরী আরও জানান, রাত সাড়ে ৯টার দিকে তারা টেলিভিশন দেখছিলেন। হঠাৎ কয়েকটি গাড়িতে আসা র‌্যাব সদস্যরা তাদের বাড়িতে ঢোকে। এরপর আরও কয়েকটি গাড়িতে র‌্যাব সদস্যরা এসে বাড়িটি ঘিরে ফেলে। কয়েকজন র‌্যাব সদস্য তাদের ঘরে ঢুকে খোঁজ-খবর নেয়। কিছু সময় পর র‌্যাব সদস্যরা সম্রাট ও তার সহযোগী আরমানকে ভবনের দোতলা থেকে নামিয়ে আনে।

প্রতিবেশী আবুল কালাম ও রমজান আলী মিয়া জানান, ‘মনির চৌধুরী জামায়াতের সক্রিয় নেতা। এলাকায় তিনি পাঞ্জা-ছক্কা নামে পরিচিত। মাঝে-মধ্যে কালো কালারের গাড়িতে করে বিভিন্ন লোকজনকে বাড়িতে নিয়ে আসতেন। তারা কখন যেত তা জানতেন না প্রতিবেশীরা। তবে কয়েকদিন ধরে বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়া-আসার সময় দুই জন ব্যক্তিকে দেখা যেত। পুকুরে বরশি দিয়ে মাছ ধরতেন। ১০ থেকে ১৫ দিন ধরে তাদের দেখা যায়।’

আবদুল কুদ্দুস নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘মনির চৌধুরী ছাত্রশিবিরের নেতা ছিলেন। পরে তিনি জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন। মনির ফেনীতে থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য করেন। ২০১৩-১৪ সময়ে তার ভাতিজা নাজিম চট্টগ্রামে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালাতে গিয়ে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন। এছাড়া তার আরেক ভাতিজা তসলিম কুঞ্জুশ্রীপুর গ্রামের চৌধুরী বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ ককটেলসহ আটক হয়। পরে ফেনীর এই মেয়রের মাধ্যমে পুলিশের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে আনে। মনির চৌধুরী এবং তার বাড়ির সবাই জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ফেনী পৌর আওয়ামী লীগের মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা আলাউদ্দিন তাদের সহযোগিতা করে আসছেন।’

চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ আল মাহফুজ বলেন, অভিযানের বিষয়ে পুলিশের কাছে কোনো তথ্য ছিল না। পরিবহন ব্যবসায়ী মনির চৌধুরীকে আমি চিনি না।

কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ নূরুল ইসলাম বলেন, ‘শুনেছি ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িত ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে চৌদ্দগ্রাম থেকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। এর বেশি কিছু বলতে পারবো না।’

প্রসঙ্গত, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আলকরা ইউনিয়নের কুঞ্জুশ্রীপুর গ্রাম এই মুহূর্তে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এলাকাটি সীমান্ত থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হওয়ায় সম্রাট-আরমান গ্রেফতারের পর স্থানীয় লোকজন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, সম্রাট ফেনী বা চৌদ্দগ্রামের এ সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েই ওই গ্রামে আত্মগোপন করেছিলেন।

চলমান ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগের কারণে যুবলীগ নেতা সম্রাটের নাম আলোচনায় আসে। অভিযানে যুবলীগ, কৃষক লীগ ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা র‍্যাব ও পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। কিন্তু সম্রাট ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

Sharing is caring!