আদালত প্রতিবেদক->>

সোনাগাজীর আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের পর আগুন দিয়ে হত্যা মামলার সাক্ষ্য ও জেরা কার্যক্রম শেষে বুধবার রাষ্ট্র পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন সরকারী কৌঁসুলী হাফেজ আহম্মদ। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি বলেন, আসামীরা মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার নির্দেশে ৬ এপ্রিল পরিকল্পিত ভাবে নুসরাতকে ডেকে মাদরাসার সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। ১০ এপ্রিল রাতে নুসরাত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে মারা যায়।

ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদের আদালতে বুধবার মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত হত্যা মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের প্রথম দিন সরকারী কৌসুলী হাফেজ আহম্মদ তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তাঁর অসমাপ্ত বক্তব্য পরদিন বৃহস্পতিবার উপস্থাপন করার কথা রয়েছে।

আদালতে তিনি বলেন, ৬ এপ্রিল সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে নুসরাত পরীক্ষার হলে যায়। তাঁর বান্ধবী নিশাত সুলতানাকে মাদরাসার সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে মারধর করা হচ্ছে বলে উম্মে সুলতানা পপি ওরফে চম্পা তাঁকে ডেকে নিয়ে যায়। ছাদে বোরকা পরা চারজন অবস্থান করছিলেন। তারা হলেন- শাহাদাত হোসেন শামীম, জোবায়ের আহম্মদ, জাবেদ হোসেন ও কামরুন নাহার মনি। তাঁরা মাদরাসা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নুসরাতের মায়ের মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেয়। নুসরাত রাজী না হলে তাঁকে ছাদের ওপর শুয়ে ফেলা হয় এবং ওড়না ছিঁড়ে হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে তাঁরা দ্রুত পালিয়ে যায়।

পিপি বলেন, ঘটনা শুরু হয় ২৭ মার্চ। ওই দিন মাদরাসার পিয়ন নুরুল আমিনকে দিয়ে অধ্যক্ষ নুসরাতকে তাঁর কক্ষে ডেকে নিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে হাত দেয়, জড়িয়ে ধরে শ্লীলতাহানি ও যৌন হয়রানী করেন। এ ঘটনায় নুসরাতের মা শিরিনা আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারায় মামলা দায়ের করেন। ওই দিনই মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়।

সরকারী কৌঁসুলী বলেন, ২৮ অক্টোবর অধ্যক্ষ সিরাজের পক্ষে ও বিপক্ষে সোনাগাজীতে মানববন্ধন করা হয়। অধ্যক্ষের পক্ষে মাকসুদ আলম কাউন্সিলার, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, জোবায়ের, শিক্ষক আফছার উদ্দিন, মহি উদ্দিন শাকিল, জাবেদ, পপি, মনি, রানা, মো. শামীম সক্রীয় ভাবে মানববন্ধনে অংশগ্রহন করে এবং শিক্ষার্থীদেরকে জোর করে মানববন্ধনে যেতে বাধ্য করা হয়।

তিনি আদালতে বলেন, আসামীদের আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেই দেখা যায়, ১ এপ্রিল ও নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, ইমরান হোসেন রানা, হাফেজ আবদুল কাদের, বিবি জোহরা এবং ৩ এপ্রিল মাওলানা মোহাম্মদ হোসাইন, শাহাদাত হোসেন শামীম, নুর উদ্দিন, রানা, জাবেদসহ কয়েকজন কারাগারে অধ্যক্ষের সাথে দেখা করেন। ওইদিন শাহাদাত হোসেন শামীম ও নুর উদ্দিনের সাথে অধ্যক্ষ একান্ত ভাবে কথা বলেন। ওই সময় অধ্যক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের জন্য নুসরাতকে চাপ দিতে বলেন। যদি রাজী না হয়- প্রয়োজনে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে প্রচার করতে বলা হয়। ৪ এপ্রিল মাদরাসার হোষ্টেলে একাধিক সভা করা হয়। শাহাদাত হোসেন শামীম কেরোসিন করবে, কামরুন নাহার মনি বোরকা নিয়ে আসবে এবং কারা ছাদে থাকবে, কারা সাইক্লোন শেল্টারের নীচে থাকবে এবং কারা মাদরাসার গেইটে থাকবে সব দায়িত্ব ঠিক করা হয়। ওই বৈঠকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা মুক্তি পরিষদ গঠন করা হয়।

এতে নুর উদ্দিনকে আহবায়ক, শাহাদাত হোসেন শামীম যুগ্ম আহবায়ক ও মহি উদ্দিন শাকিলকে সদস্য সচিব করা হয়। বৈঠকে জাবেদ জোবায়ের, ইমরান হোসেন মামুন, ইফতেখার হোসেন রানা,আবদুর রহিম শরীফ, মো. শামীমসহ অনেকেই ছিলেন।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের দায়ে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এর জের ধরে গত ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষা কেন্দ্রে গেলে নুসরাতকে ছাদে ডেকে নিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে করা শ্লীলতহানির মামলা তুলে না নেওয়ায় তাকে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে; যা মৃত্যুশয্যায় নুসরাত বলে গেছেন। এরপর টানা পাঁচদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ১০ এপ্রিল মারা যান নুসরাত জাহান রাফি।

এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। এ মামলায় মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, উম্মে সুলতানা পপি, কামরুন নাহার মনি, জাবেদ হোসেন, আবদুর রহিম ওরফে শরীফ, হাফেজ আবদুল কাদের ও জোবায়ের আহমেদ, এমরান হোসেন মামুন, ইফতেখার হোসেন রানা ও মহিউদ্দিন শাকিল আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নুসরাত হত্যা মামলায় সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ দৌলা (৫৭), নুর উদ্দিন (২০), শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর (৫০), সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন (১৯), হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), আবছার উদ্দিন (৩৩), কামরুন নাহার মনি (১৯), উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ওরফে তুহিন ওরফে চম্পা/শম্পা (১৯), আব্দুর রহিম শরীফ (২০), ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), ইমরান হোসেন ওরফে মামুন (২২), সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদরাসার সাবেক সহসভাপতি রুহুল আমিন (৫৫), মহিউদ্দিন শাকিল (২০) ও মোহাম্মদ শামীমের (২০) সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে আদালতে চার্জশিট দেয়।

এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান, বান্ধবী নিশাত সুলতানা ও সহপাঠী নাসরিন সুলতানা, মাদ্রাসার পিয়ন নুরুল আমিন, নৈশপ্রহরী মো. মোস্তফা, কেরোসিন বিক্রেতা লোকমান হোসেন লিটন, বোরকা দোকানদার জসিম উদ্দিন, দোকানের কর্মচারী হেলাল উদ্দিন ফরহাদ, নুসরাতের ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান, জহিরুল ইসলাম, হল পরিদর্শক বেলায়েত হোসেন, নুসরাতের মা শিরিন আখতার ও শিক্ষক আবুল খায়ের, মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটি সাবেক সদস্য শেখ আবদুল হালিম মামুন ও সোনাগাজী মাদ্রাসার দপ্তরি মো. ইউসুফ, সোনাগাজী মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. হোসাইন, সোনাগাজী পৌরসভার ২নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. ইয়াছিন ও অ্যাম্বুলেন্স চালক নুরুল করিম, মাদ্রাসার পরীক্ষা কেন্দ্র সচিব মাওলানা নুরুল আফসার ফারুকী, মাদ্রাসাছাত্রী তানজিনা বেগম সাথী ও বিবি জাহেদা বেগম তামান্না, মাদরাসার বাংলা বিভাগের প্রভাষক খুজিস্তা খানম, মাদরাসার আয়া বেবি রানি দাস, আকলিমা আকলিমা আক্তার, মো. কায়সার, ফাহমিদা আক্তার, নাসরিন সুলতানা, মোহাম্মদ কবির আহমেদ, মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী তাহমিনা আক্তার, বিবি হাজেরা, আবু বকর ছিদ্দিক, স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. আকবর, পুলিশ কনস্টেবল মো. রাসেল হোসেন, এসআই (শিক্ষানবিশ) ডি এইচ এম জহির রায়হান ও মো. আরিফুর রহমান, মো. আজহারুল ইসলাম এমরান ও মো. ওমর ফারুক, আসামী উম্মে সুলতানা পপির চাচি মোসাম্মৎ রাবেয়া আক্তার, সোনাগাজীর মঙ্গলকান্দি ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেন, স্থানীয় দোকানদার মো. ফজলুল করিম ও স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. জাফর ইকবাল, সোনাগাজী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মুহাম্মদ মহীউদ্দিন চৌধুরী, কলেজের উপাধ্যক্ষ রেজা মোহাম্মদ এনামুল হক চৌধুরী, স্থানীয় হাফেজ মোবারক হোসেন, মো. ইব্রাহিম, মো. নুর উদ্দিন ও আকরাম হোসেন, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার শিক্ষক সেলিমুর রেজা, মো. আবুল কাশেম, এমদাদ হোসেন পিংকেল ও স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান, মোশারেফ হোসেন, মো. গোলাম মাওলা, মনির হোসেন, ফেনীর জেল সুপার রফিকুল কাদের, কারারক্ষী মো. শাহনেওয়াজ, মো. রিপন, ছবি রঞ্জন ত্রিপুরা, স্থানীয় ওষুধ ব্যবসায়ী মো. গোলাম মাওলা, মোশারেফ হোসেনের, নুসরাতের বাবা একেএম মুসা, চাচাতো ভাই মুহাম্মদ আলী ও মামা সৈয়দ সেলিম, ফেনী জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক আবু তাহের ও সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক আরমান বিন আবদুল্লাহ, ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মো. জাকির হোসাইন, রাসায়নিক পরীক্ষক পিংকু পোদ্দার, সহকারী রাসায়নিক পরীক্ষক মো. নজরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম সিআইডির সহকারী ও রাসায়নিক পরীক্ষক রোমানা আক্তার, পিবিআইয়ের ডিজিটাল ল্যাব পরিদর্শক মোহাম্মদ আব্দুল বদি, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডকারি সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সরাফ উদ্দিন, পিবিআইয়ের পরিদর্শক মোহাম্মদ জুয়েল মিঞা ও ফেনী পিবিআইয়ের এসআই মো. হায়দার আলী আকন, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ, ডা. প্রদীপ বিশ্বাস, ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস, বার্ন ইউনিটের মেডিকেল অফিসার ডা. ওবায়দুল ইসলাম, ডা. এ কে এম মনিরুজ্জামান এবং সিনিয়র স্টাফ নার্স অর্চনা পাল, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আল আমিন শেখ, সোনাগাজী থানার এসআই ময়নাল হোসেন ও নুরুল করিম, পিবিআই’র পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা, সোনাগাজী মডেল থানার সাবেক পরিদর্শক (তদন্ত) মো. কামাল হোসেন ও তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক শাহ আলম। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আসামীদের জেরা করেন আইনজীবীরা।

Sharing is caring!