ঢাকা অফিস->>

ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির বক্তব্য ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগে করা মামলায় সোনাগাজী মডেল থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন নুসরাতের মা।

বুধবার বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আ স সামশ জগলুল হোসেনের আদালতে নুসরাতের মা শিরিন আক্তার ও তার ভাই রাশেদ হাসান সাক্ষ্য দেন। সাক্ষ্য শেষে তাদের জেরা করেন ওসি মোয়াজ্জেমের আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ। আদালত পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ১৯ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেছেন। এ নিয়ে পাঁচজনের সাক্ষ্য শেষ হয়েছে।

নুসরাত জাহান রাফির মা শিরিন আক্তার আদালতকে বলেন, ‘সোনাগাজী মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা আমার মেয়ে নুসরাত জাহান রাফিকে শ্লীলতাহানি করেন। সেই ঘটনায় মামলা করার জন্য গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানাতে যাই। আমি এবং আমার ছেলেকে ওসির কক্ষে ঢুকতে না দিয়ে আমার মেয়ে নুসরাত জাহান রাফির বক্তব্য নেন সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। ওসি মোয়াজ্জেম আমার মেয়ের মেকআপ (নেকাব) খুলিয়ে নিজের মোবাইল দিয়ে ভিডিও করেছেন। ওসির কক্ষ থেকে বের হওয়ার পর নুসরাত এই কথা বলে অনেক কান্নাকাটি করে।’

শিরিন আক্তার আদালতকে বলেন, ‘মেয়েকে শ্লীলতাহানি করায় আমি বাদী হয়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে সোনাগাজী থানায় মামলা করি। এই মামলার পর গত ৬ এপ্রিল যে সময় নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়া হয় তার ৩০ মিনিট পর ওসি মোয়াজ্জেম সেই ভিডিও মিডিয়ায় ছেড়ে দেন, যা খুবই দুঃখজনক’, বলেন নুসরাতের মা।

শিরিন আক্তারের জবানবন্দি রেকর্ড শেষ হলে তাকে জেরা করেন মোয়াজ্জেম হোসেনের আইনজীবী ফারুক আহমেদ। জেরার জবাবে শিরিন আক্তার আদালতকে বলেন, ‘নুসরাতের ভিডিও যখন ওসি মোয়াজ্জেম রেকর্ড করেন তখন তার রুমে আর কে কে ছিল, তা আমি জানি না। কারণ আমি তখন ওই রুমে ছিলাম না। আমাকে ওই রুমে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।’

আসামিপক্ষের আইনজীবীর আরেক প্রশ্নের জবাবে নুসরাতের মা বলেন, ‘মোয়াজ্জেম হোসেন আমার মেয়ের যে ভিডিও করেছিল, তা সারা বিশ্ব দেখেছে। এই ভিডিও ছেড়ে দেওয়ায় আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছি।’

নুসরাত জাহান রাফির ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান আদালতকে বলেন, ‘মামলা করতে যাওয়ার পর ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন তাদের তার রুমে ঢুকতে দেয়নি। আমার বোনকে ভিডিও করার নামে আপত্তিকর প্রশ্ন করেছেন। নেকাব খুলে ভিডিও করায় আমার বোন ওসির রুম থেকে বেরিয়ে অনেক কান্নাকাটি করেছিল। অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করার পর আমাদের কোনো প্রকারের নিরাপত্তা দেননি ওসি। যদি ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন আমার বোনকে নিরাপত্তা দিতেন, তাহলে হয়তো আমার বোন এইভাবে মারা যেত না।’

গত ১৭ জুলাই বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আ স সামশ জগলুল হোসেন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। ১৭ জুন বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আ স শামস জগলুল হোসেন ওসি মোয়াজ্জেমের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ১৬ জুন রাজধানীর শাহবাগ থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

২৭ মে বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক পিবিআইয়ের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে এ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। আসামি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেন মামলার বাদী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন।

গত ১৫ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (প্রত্যাহার হওয়া) মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলার আবেদন করেন ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। আদালত তার জবানবন্দি নিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এর ২৬, ২৯ ও ৩১ ধারায় করা অভিযোগটি পিটিশন মামলা হিসেবে গ্রহণ করেন। পরে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন আদালত।

গত ২৭ মার্চ নুসরাত জাহান রাফিকে শ্রেণিকক্ষে নিয়ে যৌন নিপীড়ন করেন মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা। এমন অভিযোগ উঠলে দুজনকে থানায় নিয়ে যান ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। এ সময় ওসি নিয়ম ভেঙে জেরা করেন এবং নুসরাতের বক্তব্য ভিডিও করেন।

মৌখিক অভিযোগ নেয়ার সময় দুই পুরুষের কণ্ঠ শোনা গেলেও সেখানে নুসরাত ছাড়া অন্য কোনো নারী বা তার আইনজীবী ছিলেন না। ভিডিওটি প্রকাশ হলে অধ্যক্ষ ও তার সহযোগীদের সঙ্গে ওসির সখ্যতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।

ভিডিওতে দেখা যায়, থানার ওসির সামনে অঝোরে কান্না করছেন নুসরাত জাহান রাফি। সেই কান্নার ভিডিও করছিলেন সোনাগাজী থানার ওসি। নুসরাত তার মুখ দুই হাতে ঢেকে রেখেছিলেন। তাতেও ওসির আপত্তি। বারবারই ‘মুখ থেকে হাত সরাও, কান্না থামাও’ বলার পাশাপাশি তিনি এও বলেন, ‘এমন কিছু হয়নি যে এখনও তোমাকে কাঁদতে হবে।’

মামলায় অভিযোগ করা হয়, ওসি মোয়াজ্জেম অনুমতি ছাড়া নিয়মবহির্ভূতভাবে নুসরাতকে জেরা এবং তা ভিডিও করেন। পরবর্তীতে ওই ভিডিও ফেসবুক ও ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ভিডিওতে দেখা যায়, ওসি মোয়াজ্জেম অত্যন্ত অপমানজনক ও আপত্তিকর ভাষায় একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছেন নুসরাতকে। নুসরাতের বুকে হাত দিয়ে শ্লীলতাহানি করা হয়েছে কি না -এমন প্রশ্নও করতে শোনা যায় ওসি মোয়াজ্জেমকে।

অধ্যক্ষের নিপীড়নের ঘটনায় রাফির মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। এরপর গত ৬ এপ্রিল সকালে নুসরাত পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসায় গেলে মাদরাসার এক ছাত্রী তার বান্ধবী নিশাতকে ছাদের ওপর কেউ মারধর করছে -এমন সংবাদ দিলে তিনি ওই বিল্ডিংয়ের চার তলায় যান।

সেখানে মুখোশ পরা চার-পাঁচজন তাকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগ তুলে নিতে চাপ দেয়। নুসরাত অস্বীকৃতি জানালে তারা তার গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়। গত ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় নুসরাতের।

Sharing is caring!