আদালত প্রতিবেদক->>

সোনাগাজীর আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের পর আগুন দিয়ে হত্যা মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা শেষ হয়েছে। সোমবার আদালতে ১৬ আসামীকে ৩৪২ ধারায় সরাসরি ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে মামলার আসামী পর্ব শেষ হয়। আদালত আগামী বুধবার থেকে বাদি বিবাদী পক্ষের যুক্তিতর্কের তারিখ ধার্য করেছে।

পিপি হাফেজ আহাম্মদ জানান, সকালে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদের আদালতে মামলার বাদি নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক শাহ আলমকে জেরা করেন আসামী পক্ষের আইনজীবী। জেরা শেষে আদালত ফৌজদারী দণ্ডবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও যাচাই বাছাই পর্ব শুরু করেন। আদালত প্রত্যেক আসামিকে পৃথক পৃথকভাবে ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। এর আগে নুসরাত হত্যা মামলায় ৯২ জন সাক্ষীর মধ্যে ৮৭ জনের সাক্ষ্য ও জেরা করা হয়।

সোমবার আদালতে প্রত্যেক আসামিকে পিপি হাফেজ আহাম্মদ তার কৃতকর্ম, অপরাধ, ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি, স্বাক্ষীদের বক্তব্য ও নুসরাত হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ বর্ণনা করেন। প্রথমেই মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে তার ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, সাক্ষ্যদের বক্তব্য ও প্রমাণ বর্ননা করেন পিপি। এভাবে এক এক করে প্রত্যেক আসামিকে তার অপরাধের বর্ণনা শুনান। পরে বিচারক প্রত্যেক আসামির কাছে তার বক্তব্য জানতে চান। আসামিদের বক্তব্যের পর আসামিকে ৩-৪টি প্রশ্ন করেন করেন বিচারক। তিনি জড়িত কি-না, নুসরাতের মৃত্যু কিভাবে হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। কেন তাকে আসামি করা হয়েছে।

আদালত এ সময় বলেন, আসামিদের বক্তব্যের মাধ্যমে সত্য উদঘাটিত হবে। আদালত এসময় সন্তান সম্ভবা আসামী কামরুন নাহার মনিকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দিয়েছে।

পিপি হাফেজ আহাম্মদ জানান, আদালতে প্রত্যেক আসামি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বক্তব্য দেন। আসামিদের কয়েকজন অভিযোগ করেন, পিবিআই নির্যাতনের মাধ্যমে ১৬৪ ধারায় তাদের স্বীকারোক্তি আদায় করেছে।

সিরাজ দাবি করেন, তার সঙ্গে কারাগারে থেকে কোন আসামি সাক্ষাত করেননি, তিনি কাউকে হত্যার নির্দেশ দেননি, পিবিআই বৈদ্যুতিক শকসহ শারীরিক নির্যাতন করে তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করে। তিনি নিজেকে নির্দোষ বলে নুসরাতকে নিজের মেয়ের মতো দাবি করে তার হত্যার বিচার চেয়ে সাফাই সাক্ষী দিবেন না জানিয়ে লিখিত বক্তব্য আদালতে পেশ করেন।

এরপর পিপি আসামি নুর উদ্দিনের অপরাধ বর্ননা করে তার বক্তব্য জানতে চাইলে সে জানায়, তাকে গ্রেফতারের পর স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য ঢাকা পিবিআই সদর দপ্তরে তার উপর দুই দিন ধরে শারীরিক নির্যাতন চালায়। এ সময় তাকে বৈদ্যুতিক পাখার সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা ঝুলিয়ে রাখে, বৈদ্যুতিক শক দেওয়া দেয়। স্বীকারোক্তি আদায় করতে ব্যার্থ হয়ে তাকে চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে ক্রসফায়ারের ভয় দেখায়। তাকে ফেনীর আদালতে এনে পিবিআই কর্মকর্তার উপস্থিতিতে ম্যাজিষ্ট্রেট তার কাছে লিখিত কাগজে স্বাক্ষর দিতে বলেন। সে নিজেকে নির্দোষ বলে স্বাক্ষর দিতে অস্বীকার করলে ম্যাজিষ্ট্রেট তাকে লাথি দিয়ে ফেলে দিয়ে পুনরায় রিমান্ডে দেওয়ার ভয় দেখায়। পরে বাধ্য হয়ে ম্যাজিষ্ট্রেটের লিখিত কাগজে স্বাক্ষর করেন। সে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে সাফাই সাক্ষী দিবে না জানিয়ে আদালতে লিখিত বক্তব্য জমা দিয়ে ন্যায় বিচার প্রার্থনা করেন।

আসামী কামরুন নাহার মনি আদালতকে জানায় সে ঘটনার সময় ৫ মাসের গর্ভবতী ছিলেন, পিবিআই তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে স্বীকারোক্তি প্রদানের জন্য শারীরিক ও মানষিকভাবে নির্যাতন করে। তার উপর নির্যাতন দেখে সহ্য করতে না পেরে হেফাজতে থাকা অপর আসামি যোবায়ের তাকে মনির পরিবর্তে নির্যাতনের জন্য পিবিআই কর্মকর্তার কাছে অনুরোধ জানায়। একপর্যায়ে তার পেটে লাথি মেরে গর্ভ নষ্টের ভয় দেখিয়ে তাদের লিখিত কাগজে স্বাক্ষর আদায় করেন।

আসামিরা তাদের এ বক্তব্য লিখিতভাবেও আদালতে দাখিল করেন। কয়েক আসামিকে এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। আদালত আসামিদের দাখিল করা আবেদন গ্রহণ করেন ও বক্তব্যের সারবস্তু লিপিবদ্ধ করেন।

মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী শাহজাহান সাজু বলেন, বুধবার আসামিদের কথোপকথনের রেকর্ড আদালতে প্রদর্শনের পর শুরু হবে বাদী ও বিবাদী পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিকর্ত। যুক্তিতর্ক শেষ হলে রায়ের তারিখ ঘোষণা করবেন আদালত।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের দায়ে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এর জের ধরে গত ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষা কেন্দ্রে গেলে নুসরাতকে ছাদে ডেকে নিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে করা শ্লীলতহানির মামলা তুলে না নেওয়ায় তাকে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে; যা মৃত্যুশয্যায় নুসরাত বলে গেছেন। এরপর টানা পাঁচদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ১০ এপ্রিল মারা যান নুসরাত জাহান রাফি।

এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। এ মামলায় মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, উম্মে সুলতানা পপি, কামরুন নাহার মনি, জাবেদ হোসেন, আবদুর রহিম ওরফে শরীফ, হাফেজ আবদুল কাদের ও জোবায়ের আহমেদ, এমরান হোসেন মামুন, ইফতেখার হোসেন রানা ও মহিউদ্দিন শাকিল আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নুসরাত হত্যা মামলায় সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ দৌলা (৫৭), নুর উদ্দিন (২০), শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর (৫০), সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন (১৯), হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), আবছার উদ্দিন (৩৩), কামরুন নাহার মনি (১৯), উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ওরফে তুহিন ওরফে চম্পা/শম্পা (১৯), আব্দুর রহিম শরীফ (২০), ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), ইমরান হোসেন ওরফে মামুন (২২), সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদরাসার সাবেক সহসভাপতি রুহুল আমিন (৫৫), মহিউদ্দিন শাকিল (২০) ও মোহাম্মদ শামীমের (২০) সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে আদালতে চার্জশিট দেয়।

এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান, বান্ধবী নিশাত সুলতানা ও সহপাঠী নাসরিন সুলতানা, মাদ্রাসার পিয়ন নুরুল আমিন, নৈশপ্রহরী মো. মোস্তফা, কেরোসিন বিক্রেতা লোকমান হোসেন লিটন, বোরকা দোকানদার জসিম উদ্দিন, দোকানের কর্মচারী হেলাল উদ্দিন ফরহাদ, নুসরাতের ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান, জহিরুল ইসলাম, হল পরিদর্শক বেলায়েত হোসেন, নুসরাতের মা শিরিন আখতার ও শিক্ষক আবুল খায়ের, মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটি সাবেক সদস্য শেখ আবদুল হালিম মামুন ও সোনাগাজী মাদ্রাসার দপ্তরি মো. ইউসুফ, সোনাগাজী মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. হোসাইন, সোনাগাজী পৌরসভার ২নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. ইয়াছিন ও অ্যাম্বুলেন্স চালক নুরুল করিম, মাদ্রাসার পরীক্ষা কেন্দ্র সচিব মাওলানা নুরুল আফসার ফারুকী, মাদ্রাসাছাত্রী তানজিনা বেগম সাথী ও বিবি জাহেদা বেগম তামান্না, মাদরাসার বাংলা বিভাগের প্রভাষক খুজিস্তা খানম, মাদরাসার আয়া বেবি রানি দাস, আকলিমা আকলিমা আক্তার, মো. কায়সার, ফাহমিদা আক্তার, নাসরিন সুলতানা, মোহাম্মদ কবির আহমেদ, মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী তাহমিনা আক্তার, বিবি হাজেরা, আবু বকর ছিদ্দিক, স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. আকবর, পুলিশ কনস্টেবল মো. রাসেল হোসেন, এসআই (শিক্ষানবিশ) ডি এইচ এম জহির রায়হান ও মো. আরিফুর রহমান, মো. আজহারুল ইসলাম এমরান ও মো. ওমর ফারুক, আসামী উম্মে সুলতানা পপির চাচি মোসাম্মৎ রাবেয়া আক্তার, সোনাগাজীর মঙ্গলকান্দি ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেন, স্থানীয় দোকানদার মো. ফজলুল করিম ও স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. জাফর ইকবাল, সোনাগাজী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মুহাম্মদ মহীউদ্দিন চৌধুরী, কলেজের উপাধ্যক্ষ রেজা মোহাম্মদ এনামুল হক চৌধুরী, স্থানীয় হাফেজ মোবারক হোসেন, মো. ইব্রাহিম, মো. নুর উদ্দিন ও আকরাম হোসেন, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার শিক্ষক সেলিমুর রেজা, মো. আবুল কাশেম, এমদাদ হোসেন পিংকেল ও স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান, মোশারেফ হোসেন, মো. গোলাম মাওলা, মনির হোসেন, ফেনীর জেল সুপার রফিকুল কাদের, কারারক্ষী মো. শাহনেওয়াজ, মো. রিপন, ছবি রঞ্জন ত্রিপুরা, স্থানীয় ওষুধ ব্যবসায়ী মো. গোলাম মাওলা, মোশারেফ হোসেনের, নুসরাতের বাবা একেএম মুসা, চাচাতো ভাই মুহাম্মদ আলী ও মামা সৈয়দ সেলিম, ফেনী জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক আবু তাহের ও সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক আরমান বিন আবদুল্লাহ, ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মো. জাকির হোসাইন, রাসায়নিক পরীক্ষক পিংকু পোদ্দার, সহকারী রাসায়নিক পরীক্ষক মো. নজরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম সিআইডির সহকারী ও রাসায়নিক পরীক্ষক রোমানা আক্তার, পিবিআইয়ের ডিজিটাল ল্যাব পরিদর্শক মোহাম্মদ আব্দুল বদি, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডকারি সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সরাফ উদ্দিন, পিবিআইয়ের পরিদর্শক মোহাম্মদ জুয়েল মিঞা ও ফেনী পিবিআইয়ের এসআই মো. হায়দার আলী আকন, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ, ডা. প্রদীপ বিশ্বাস, ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস, বার্ন ইউনিটের মেডিকেল অফিসার ডা. ওবায়দুল ইসলাম, ডা. এ কে এম মনিরুজ্জামান এবং সিনিয়র স্টাফ নার্স অর্চনা পাল, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আল আমিন শেখ, সোনাগাজী থানার এসআই ময়নাল হোসেন ও নুরুল করিম, পিবিআই’র পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা, সোনাগাজী মডেল থানার সাবেক পরিদর্শক (তদন্ত) মো. কামাল হোসেন ও তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক শাহ আলম। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আসামীদের জেরা করেন আইনজীবীরা।

Sharing is caring!