আদালত প্রতিবেদক->>

সোনাগাজীর আলোচিত নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় মঙ্গলবার ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে দুই আসামীর কথোকপথনের অডিও রেকর্ডিং ও নুসরাতের মৃত্যুকালীন জবানবন্দির ভিডিও প্রজেক্টরের মাধ্যমে প্রদর্শন করেছে তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক শাহ আলম। সাক্ষ্য গ্রহণের পর জেরা শুরু হলে বিচারক মামুনুর রশিদ বুধবার পুনরায় জেরা শুরু হবে আদেশ দিয়ে আদালতের কার্যক্রম মুলতবী করেন।

বাদী পক্ষের আইনজীবী শাহজাহান সাজু বলেন, গত ২১ আগস্ট বুধবার পরিদর্শক শাহ আলম সাক্ষ্য প্রদান শুরু করে মঙ্গলবার দুপুরে আদালতে সাক্ষ্য প্রদান শেষ করেন। সাক্ষ্য সমাপ্ত হওয়ার তিনি নুসরাত হত্যা মামলার দুই আসামী রুহুল আমিন ও শাহাদাত গোসেন শামিমের কথোকপথনের ২৬ সেকেন্ডের অডিও আদালতে প্রদর্শন করেন।এরপর প্রজেক্টরের মাধ্যমে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে নুসরাতের মৃত্যুকালীন জবানবন্দি প্রদানের ভিডিও প্রদর্শন করেন। এসব অডিও ভিডিও প্রদর্শন ছাড়াও তিনি আসামী শামিমের সাথে তার এক বন্দুর ৫৭ সেকেন্ডে কথোকপথনের আংশিক শুনান। অডিও ভিডিও প্রদর্শনের সময় পুরো আদালত কক্ষে পিন পিন নিরবতা নেমে আসে। উপস্থিত আইনজীবী ও গনমাধ্যমের কর্মীরা শান্তভাবে ধৈর্য্য সহকারে অডিও শুনেন ও ভিডিও দেখেন।এসময় আদালত কক্ষে উপস্থিত নুসরাতের ছোট ভাই রাসেদুল হাসান রায়হানকে ফুঁপিয়ে ফুফিয়ে কাঁদতে দেখা যায়। ভিডিওতে নুসরাত ঘটনার বর্ননা করে কোন আসামীর নাম বলতে শুনা না গেলেও শম্পা নামে একজন তাকে মাদ্রসার ছাদে ডেকে নিয়ে গেছে বলতে শুনা গেছে।

আদালতে প্রদর্শিত অডিওতে জানা গেছে গত ৬ এপ্রিল সকাল ১০টা ১৪ মিনিটে শাহাদাত হোসেন শামিম তার ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বার ০১৮৬৪০৮০৫৬৫ হতে রুহুল আমিনের ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বার ০১৮৪২৪৪৭৩৪৪ এ কল করে ঘটনাটি জানতে তার সাথে ২৬ সেকেন্ড কথা বলে। শামিমের কল রুহুল আমিন রিসিভ করে বলে হ্যালো … হ্যালো, শামিম বলে “জি, স্লামালাইকুম ভাইয়া, ভাইয়া আমনে কন্ডে? জবাবে রুহুল আমিন বলে ওয়ালাইকুম সালাম, আঁই বাসায়। তখন শামিম বলে, “ওই খবর ইয়ান হুইনছেন নি ভাইয়া? জবাবে রুহুল আমিন বলে অ্যাঁ, হুইনছি, অন কি অবস্থা? তখন শামিম বলে, আঁইতো ভাইয়া বাইত, আঁইতো হেদিকে যাই ন। পরীক্ষা যেন।বাইর অইতাম নি বাই..তুন? জবাবে রুহুল আমিন বলে, “তোরা আইস না। তোগো বদনামি অইবো”। উত্তরে শামিম বলে, “আচ্ছা। আইতাম না তাহলে ক্যান?”। তখন রুহুল আমিন বলে, না। শেষে শামিম বলে, আইচ্ছা, ঠিক আছে। স্লামালাইকুম।

অডিও ভিডিও প্রদর্শনের পর আদালতের বিচারক মামুনুর রশিদ আসামী রুহুল আমিনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বিচারককে জানান, ঘটনার দিন উপজেলা নির্বাচন পরবর্তী মিটিং নিয়ে ব্যাস্ত থাকার সময় শামিম তাকে ফোন দিয়ে মিটিংয়ে আসতে চাইলে তিনি তাকে মিটিংয়ে আসতে নিষেধ করেন।

আদালতে অডিও ভিডিও প্রদর্শন শেষে পিবিআই পরিদর্শক শাহ আলমকে আংশিক জেরা করেন ঢাকা বারের সিনিয়র আইনজীবি ফারুক হোসেন। আসামী রুহুল আমিনের আইনজীবী আদালতকে জানান, আদালতে প্রদর্শিত অডিওর সাথে মামলার অভিযোগপত্রে উল্লেখিত তথ্যে গরমিল রয়েছে। তিনি আদালতের কাছে অডিও ভিডিওর সিডি চাইলে বিচারক সেগুলো যতবার শুনার ও দেখার প্রয়োজন ততবার শুনানো ও দেখানো হবে বলে আশ্বস্ত করেন।

জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট হাফেজ আহাম্মদ জানান, গত ২৭ জুন থেকে মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। নুসরাত হত্যা মামলায় ৯২ সাক্ষীর মধ্যে আদালতে এ পর্যন্ত বাদীসহ ৮৭ জনের সাক্ষ্য ও জেরা সম্পন্ন হয়েছে। সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর পর থেকে সরকারী বন্ধ ছাড়া প্রতি কর্মদিবসেই আদালত সাক্ষ্যগ্রহণ চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ মামলায় এখন পর্যন্ত নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান, বান্ধবী নিশাত সুলতানা ও সহপাঠী নাসরিন সুলতানা, মাদ্রাসার পিয়ন নুরুল আমিন, নৈশপ্রহরী মো. মোস্তফা, কেরোসিন বিক্রেতা লোকমান হোসেন লিটন, বোরকা দোকানদার জসিম উদ্দিন, দোকানের কর্মচারী হেলাল উদ্দিন ফরহাদ, নুসরাতের ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান, জহিরুল ইসলাম, হল পরিদর্শক বেলায়েত হোসেন, নুসরাতের মা শিরিন আখতার ও শিক্ষক আবুল খায়ের, মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটি সাবেক সদস্য শেখ আবদুল হালিম মামুন ও সোনাগাজী মাদ্রাসার দপ্তরি মো. ইউসুফ, সোনাগাজী মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. হোসাইন, সোনাগাজী পৌরসভার ২নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. ইয়াছিন ও অ্যাম্বুলেন্স চালক নুরুল করিম, মাদ্রাসার পরীক্ষা কেন্দ্র সচিব মাওলানা নুরুল আফসার ফারুকী, মাদ্রাসাছাত্রী তানজিনা বেগম সাথী ও বিবি জাহেদা বেগম তামান্না, মাদরাসার বাংলা বিভাগের প্রভাষক খুজিস্তা খানম, মাদরাসার আয়া বেবি রানি দাস, আকলিমা আকলিমা আক্তার, মো. কায়সার, ফাহমিদা আক্তার, নাসরিন সুলতানা, মোহাম্মদ কবির আহমেদ, মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী তাহমিনা আক্তার, বিবি হাজেরা, আবু বকর ছিদ্দিক, স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. আকবর, পুলিশ কনস্টেবল মো. রাসেল হোসেন, এসআই (শিক্ষানবিশ) ডি এইচ এম জহির রায়হান ও মো. আরিফুর রহমান, মো. আজহারুল ইসলাম এমরান ও মো. ওমর ফারুক, আসামী উম্মে সুলতানা পপির চাচি মোসাম্মৎ রাবেয়া আক্তার, সোনাগাজীর মঙ্গলকান্দি ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেন, স্থানীয় দোকানদার মো. ফজলুল করিম ও স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. জাফর ইকবাল, সোনাগাজী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মুহাম্মদ মহীউদ্দিন চৌধুরী, কলেজের উপাধ্যক্ষ রেজা মোহাম্মদ এনামুল হক চৌধুরী, স্থানীয় হাফেজ মোবারক হোসেন, মো. ইব্রাহিম, মো. নুর উদ্দিন ও আকরাম হোসেন, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার শিক্ষক সেলিমুর রেজা, মো. আবুল কাশেম, এমদাদ হোসেন পিংকেল ও স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান, মোশারেফ হোসেন, মো. গোলাম মাওলা, মনির হোসেন, ফেনীর জেল সুপার রফিকুল কাদের, কারারক্ষী মো. শাহনেওয়াজ, মো. রিপন, ছবি রঞ্জন ত্রিপুরা, স্থানীয় ওষুধ ব্যবসায়ী মো. গোলাম মাওলা, মোশারেফ হোসেনের, নুসরাতের বাবা একেএম মুসা, চাচাতো ভাই মুহাম্মদ আলী ও মামা সৈয়দ সেলিম, ফেনী জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক আবু তাহের ও সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক আরমান বিন আবদুল্লাহ, ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মো. জাকির হোসাইন, রাসায়নিক পরীক্ষক পিংকু পোদ্দার, সহকারী রাসায়নিক পরীক্ষক মো. নজরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম সিআইডির সহকারী ও রাসায়নিক পরীক্ষক রোমানা আক্তার, পিবিআইয়ের ডিজিটাল ল্যাব পরিদর্শক মোহাম্মদ আব্দুল বদি, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডকারি সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সরাফ উদ্দিন, পিবিআইয়ের পরিদর্শক মোহাম্মদ জুয়েল মিঞা ও ফেনী পিবিআইয়ের এসআই মো. হায়দার আলী আকন, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ, ডা. প্রদীপ বিশ্বাস, ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস, বার্ন ইউনিটের মেডিকেল অফিসার ডা. ওবায়দুল ইসলাম, ডা. এ কে এম মনিরুজ্জামান এবং সিনিয়র স্টাফ নার্স অর্চনা পাল, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আল আমিন শেখ, সোনাগাজী থানার এসআই ময়নাল হোসেন ও নুরুল করিম, পিবিআই’র পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা, সোনাগাজী মডেল থানার সাবেক পরিদর্শক (তদন্ত) মো. কামাল হোসেন ও তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক শাহ আলমের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষ হয়েছে।

চলতি বছরের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের দায়ে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এর জের ধরে গত ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষা কেন্দ্রে গেলে নুসরাতকে ছাদে ডেকে নিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে করা শ্লীলতহানির মামলা তুলে না নেওয়ায় তাকে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে; যা মৃত্যুশয্যায় নুসরাত বলে গেছেন। এরপর টানা পাঁচদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ১০ এপ্রিল মারা যান নুসরাত জাহান রাফি।

এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। এ মামলায় মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, উম্মে সুলতানা পপি, কামরুন নাহার মনি, জাবেদ হোসেন, আবদুর রহিম ওরফে শরীফ, হাফেজ আবদুল কাদের ও জোবায়ের আহমেদ, এমরান হোসেন মামুন, ইফতেখার হোসেন রানা ও মহিউদ্দিন শাকিল আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নুসরাত হত্যা মামলায় সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ দৌলা (৫৭), নুর উদ্দিন (২০), শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর (৫০), সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন (১৯), হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), আবছার উদ্দিন (৩৩), কামরুন নাহার মনি (১৯), উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ওরফে তুহিন ওরফে চম্পা/শম্পা (১৯), আব্দুর রহিম শরীফ (২০), ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), ইমরান হোসেন ওরফে মামুন (২২), সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদরাসার সাবেক সহসভাপতি রুহুল আমিন (৫৫), মহিউদ্দিন শাকিল (২০) ও মোহাম্মদ শামীমের (২০) সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে আদালতে চার্জশিট দেয়।

Sharing is caring!