আদালত প্রতিবেদক->>

সোনাগাজীর আলোচিত মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা মামলায় বুধবার ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদের আদালতে আসামীপক্ষে আবেদনের প্রেক্ষিতে একইদিন মামলার বাদী মাহমুদুল হাসান নোমান ও সোনাগাজী পৌর মেয়র এডভোকেট রফিকুল ইসলাম খোকনের সাথে হত্যার আগে ও পরে মুঠোফোনে কথোপকথনের তথ্য (কললিস্ট) ও ম্যাসেজ আদালতে উপস্থাপন করা হয়।

আদালত সূত্র জানায়, বুধবার দুপুর ১টায় ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদের আদালতে আলোচিত এ মামলার কার্যক্রম শুরু হয়। এ সময় আসামী কাউন্সিলর মাকসুদুল আলমের পক্ষে তার আইনজীবী গিয়াস উদ্দিন নান্নুর আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালতে উপস্থিত হয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এর চেয়ারম্যানের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির সিস্টেমস্ এন্ড সার্ভিসেস বিভাগের উপ-পরিচালক খালেদ ফয়সাল রহমান রাফী হত্যা মামলার বাদী মাহমুদুল হাসান নোমানের সাথে ২৭ মার্চ থেকে ৭ই এপ্রিল সোনাগাজী পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকনের মুঠোফোনে কথোপকথনের তথ্য (কললিস্ট) ও ম্যাসেজ আদালতে উপস্থাপন করেন। তবে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে রেকর্ড করার নিয়ম থাকলেও নোমানের সাথে খোকনের কথোপকথনের ভয়েস রেকর্ড না থাকায় তা আদালতে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি বলে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

এরপর মামলার দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআই’র পরিদর্শক মো: শাহ আলমের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়ে বিরতি শেষে বিকাল ৫টা পর্যন্ত চলে। আদালত পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য রবিবার দিন ধার্য করেন।

ফেনী জজ আদালতের পিপি হাফেজ আহম্মদ জানান, ৯২ সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্ত বাদীসহ ৮৮ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। আগামী রোববার পিবিআই তদন্ত কর্মকর্তা মো: শাহ আলমের বাকী অংশ সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেন আদালত। ওইদিন বাদী পক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ বার্ণ ইউনিটের ডা. ওবায়দুল ইসলামকে আদালতে তলব করা হয়েছে।

গত ২৮ মে ফেনীর সিনিয়র জুড়িশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো: জাকির হোসাইনের আদালতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদদৌলা (৫৭), নুর উদ্দিন (২০), শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর (৫০), সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন (১৯), হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), আবছার উদ্দিন (৩৩), কামরুন নাহার মনি (১৯), উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ওরফে তুহিন ওরফে চম্পা/শম্পা (১৯), আব্দুর রহিম শরীফ (২০), ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), ইমরান হোসেন ওরফে মামুন (২২), সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদরাসা পরিচালনা কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি রুহুল আমিন (৫৫), মহিউদ্দিন শাকিল (২০) ও মোহাম্মদ শামীম (২০)কে আসামী করে ৮০৮ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দাখিল করেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কর্মকর্তারা।

৩০ মে বিচারিক হাকিম জাকির হোসাইন অভিযোগপত্রসহ মামলার নথি ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদের আদালতে পাঠিয়ে দেন। গত ১০ জুন মামলাটির অভিযোগপত্র আদালতে গ্রহণ হয়। ২০ জুন একই আদালতে আসামীদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে। ২৭ জুন মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।

নুসরাত হত্যায় ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। এ মামলায় মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, উম্মে সুলতানা পপি, কামরুন নাহার মনি, জাবেদ হোসেন, আবদুর রহিম ওরফে শরীফ, হাফেজ আবদুল কাদের ও জোবায়ের আহমেদ, এমরান হোসেন মামুন, ইফতেখার হোসেন রানা ও মহিউদ্দিন শাকিল আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।

চলতি বছরের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের দায়ে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এর জের ধরে গত ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষা কেন্দ্রে গেলে নুসরাতকে ছাদে ডেকে নিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে করা শ্লীলতহানির মামলা তুলে না নেওয়ায় তাকে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে; যা মৃত্যুশয্যায় নুসরাত বলে গেছেন। এরপর টানা পাঁচদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ১০ এপ্রিল মারা যান নুসরাত জাহান রাফি।

Sharing is caring!