বিশেষ প্রতিবেদক->>

চট্টগ্রাম ও ফেনী জেলা সীমান্তবর্তী এলাকার ফেনী নদীতে বাস্তবায়ন হওয়া মুহুরী সেচ প্রকল্প কার্যকারিতা হারাচ্ছে। নদীর ভাটি এলাকায় জমে ওঠা পলির স্তরের কারণে নদীর স্বাভাবিক গতি বদলে যাচ্ছে। ২০১৯ সাল থেকে প্রতি বর্ষা মৌসুমে দফায় দফায় ভাঙনের কবলে পড়েছে এখানকার সিডিএসপি বাঁধ, বিস্তীর্ণ এলাকা ও শত শত মৎস্য ঘের।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, ফেনী, মুহুরী ও কালিদাস নদীর সম্মিলিত পানি প্রবাহকে সেচ কাজে লাগাতে এবং চট্টগ্রামের মিরসরাই ও ফেনীর সোনাগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলা এলাকার বিস্তীর্ণ জনপদকে বন্যা ও ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে বাস্তবায়ন করা হয় মুহুরী সেচ প্রকল্প। ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরে শুরু হয়ে ১৯৮৫-৮৬ অর্থ বছরে ১৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এটির পূর্ণাঙ্গ কাজ শেষ হয়। ৪০টি স্লুইসগেট বিশিষ্ট এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হয় ১৬৮ কোটি টাকা। যার অর্থায়ন করে সিডা, ইইসি ও বিশ্বব্যাংক।

সরেজমিন দেখা গেছে, প্রকল্পের ভাটিতে প্রায় সাত শ’ বর্গমিটার এলাকা পলি জমে ৭৫ ভাগ ভরাট হয়ে গেছে। এতে নদীর পানি প্রবাহের পথ বদলে এক দিকে ছোট ছোট চর জেগে উঠছে, অন্য দিকে ভাঙন দেখা দিয়েছে। আবার সেচ প্রকল্পের বেশ কিছু সøুইস গেটে পলি জমে ইতোমধ্যে কার্যকারিতা হারিয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেন, আগামী বর্ষা মৌসুমে বাঁধ ভেঙে গেলে এখানে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দেবে। পণ্ড হয়ে যাবে মহুরী সেচ প্রকল্প। পাশের এলাকার মানুষ হারাবে ভিটেবাড়ি, কৃষক হারাবে জমি।

মিরসরাইয়ের ওছমানপুর ইউনিয়নের কামাল উদ্দিন জানান, ২০১৯ সালের শুকনো মৌসুমে প্রকল্পের ভাটির মুখে বালু ও মাটি জমাট বাঁধা শুরু হয়। ওই বছর বর্ষা শুরু হলে ভাঙন দেখা দেয়। এরপর থেকে প্রতি বছর নদীতে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি ও মৎস্য ঘের। ইতোমধ্যে শতাধিক মৎস্য ঘের নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

এ দিকে প্রতি বছর শুকনো মৌসুমে মুহুরী সেচ প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামের মিরসরাই, ফেনীর সোনাগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলার ২৭.১২৫ হেক্টর জমি ইরি চাষের আওতায় আসে। আশঙ্কা করা হচ্ছে জরুরি ভিত্তিতে ড্রেজিং করা না হলে বিগত বছরগুলোর মতো এবারো এক দিকে নদীর উজান এলাকার গ্রামের পর গ্রাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্য দিকে জমিগুলো অনাবাদি পড়ে থাকবে।

মিরসরাইয়ের ওচমানপুর ইউনিয়নের আজমপুর গ্রামের কৃষক নিজাম উদ্দিন বলেন, আমরা নদীর আচরণ বুঝি। জমা হওয়া বালু মাটি খনন করলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
মিরসরাইয়ের বিস্তীর্ণ জনপদকে বঙ্গোপসাগরের ভাঙন থেকে রক্ষা করতে ১৯৯৪ সালে চর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট প্রকল্পের (সিডিএসপি) আওতায় বাস্তবায়ন করা হয় ১১.৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে বাঁধ। এ বাঁধের কারণে এখানকার বাঁশখালী ও ইছাখালী এলাকায় গড়ে ওঠে হাজার হাজার একর মৎস্য ঘের। যা থেকে চট্টগ্রামের মৎস্য চাহিদার ৭০ ভাগ জোগান দেয়া হয়।

ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, কয়েক বছর আগে সিডিএসপি বাঁধের কিছু অংশ ভেঙে সাগরে বিলীন হয়ে যায়। ওই সময় নদীর গতি প্রকৃতি বুঝে ভেঙে যাওয়া অংশ অন্য দিক ঘুরিয়ে নতুন করে নির্মাণ করা হয়। দেখা গেছে, বাঁধের উত্তর অংশের প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা ফেনী নদীর অববাহিকায় অবস্থিত। বাকি অংশটুকু বয়ে গেছে বঙ্গোপসাগর অববাহিকায়। স্থানীয়দের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, একসময় নদী ও সাগর থেকে বাঁধের দূরত্ব ছিল প্রায় ৭০০ মিটার।

সিডিএসপি বাঁধের ভাঙন প্রসঙ্গে মিরসরাই উপজেলা চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন বলেন, এটি আমি সরেজমিন গিয়ে দেখেছি। সেখানে ভয়ংকর অবস্থা। এ বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নিতে আমরা পানিসম্পদ মন্ত্রী ও সচিব বরাবরে ই-মেইলে একটি চিঠি দিয়েছি।’

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ফেনীর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী নুরুন নবী জানান, নদীর ভাটি এলাকায় জমে থাকা পলি ড্রেজিংয়ের জন্যে আমরা আরো আগে উদ্যোগ নিয়েছি। এ বিষয়ে একটি টেকনিক্যাল কমিটিও হয়েছে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য আমরা মন্ত্রণালয়ে অর্থ চেয়ে ইতোমধ্যে চিঠি দিয়েছি। টাকা পেলেই স্বক্ষমতা যাছাই শেষে মূল প্রকল্প সাবমিট করা হবে।