সোনাগাজী প্রতিনিধি->>

যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদ করায় আগুনে পুড়ে মেরে ফেলা হয়েছে ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসারছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে। তার তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তারই ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান গত শনিবার (৯ এপ্রিল) নিজের ফেসবুকে এক আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন।

পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হলো- একদিন, দুইদিন করে করে আজ তিনটি বছর হলো, প্রিয় বোন নুসরাত জাহান রাফি আমাদের মাঝে নেই। প্রতিটি দিনই বছরের চাইতেও বেশি মনে হয়, চারপাশ যেন অন্ধকারাচ্ছন্ন। এতো আলো দিন প্রহরে, তবুও যেন অন্ধকারেই আছি। কেন না আমার বোন ছিল আমার আলো। সেই আলোই নিভিয়ে দিল কয়েকজন হিংস্র জানোয়ারের দল। হাতছানি দিতেই যেন স্পর্শ পাই আপুর। নাকে ঘ্রাণ আসে আদরমাখা ডাকের। এখনও জীবন্ত আপুর রেখে যাওয়া প্রতিটি স্মৃতি।

তিনি বলেন, ৩ বছর! আমি আপনাকে মিস করছি আপু। আমার অনুভূতি আচ্ছন্ন করে আপনি আছেন, শুধু শারীরিক উপস্থিতিটাই নেই। আপনার শূন্যতা কেউ কখনই বদলে দিতে পারেনি আপু। আপনার মতো কেউ ভালোবাসতেও পারেনি। সদাসর্বদা মনের অন্তস্থলে আপনার দেওয়া সব নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।

তিনি আরও বলেন, আজও আপনার ক্ষতবিক্ষত দেহে বাঁচার আকুতি, আমাদের অসহায়ত্ব সবকিছুই ঘিরেই যেন প্রাণহীন একটি দেহ নিয়ে চলছি ফিরছি। কিন্তু আপনার হত্যাকারীরা ও তাদের প্রেতাত্মারা রীতিমতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। প্রতিনিয়ত আমাদের পরিবারকে কোণঠাসা করে রাখতে, চুপ থাকতে কতই না কিছু করছে।’

রাশেদুল হাসান রায়হান বলেন, আমি আজ জোর দাবি জানাচ্ছি। অতি দ্রুত আমার বোনের হত্যাকারী হিংস্র নরপশুদের রায় কার্যকর করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে; যেন আমার মতো করে আর কোনো ভাই বা পরিবার ফোটার আগেই কোনো গোলাপ ফুলকে না হারায়।

সবশেষে বলেন, পবিত্র মাহে রমজানে সব ধর্মপ্রাণ মুসলমান শুভাকাঙ্ক্ষী ভাইবোনের নিকট আমার বোন নুসরাত জাহান রাফির আত্মার শান্তির জন্য দোয়া চাই।

উল্লেখ্য, নুসরাত জাহান রাফি সোনাগাজী পৌর এলাকার উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের মেজো মৌলভী বাড়ির এ কে এম মুসা মানিকের কন্যা। ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ্দৌলাহর যৌন নিপীড়নের শিকার হন রাফি। ওই ঘটনায় তার মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।

মামলা তুলে না নেয়ায় ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষার কক্ষ থেকে ডেকে নিয়ে মাদরাসার ভবনের ছাদে হাত-পা বেঁধে সহপাঠীরা তার শরীরে আগুন লাগিয়ে দেয়। ১০ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে নুসরাত মারা যায়। এ ঘটনায় ৮ এপ্রিল তার বড় ভাই মাহমুদল হাসান বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। ৬১ কার্যদিবসে ৮৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে একই বছরের ২৪ অক্টোবর মামলার অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ। পাশাপাশি প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড করেন।

দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ এস এম সিরাজউদ্দৌলা, মাদরাসার গভর্নিং কমিটির তৎকালীন সহসভাপতি রুহুল আমিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, নুরউদ্দিন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন, হাফেজ আবদুল কাদের, প্রভাষক আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা পপি, আবদুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মহিউদ্দিন শাকিল ও মোহাম্মদ শামীম।

২৯ অক্টোবর আসামিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য (ডেথ রেফারেন্স) মামলার যাবতীয় কার্যক্রম হাইকোর্টে পৌঁছে। আসামিদের পক্ষ থেকে আপিল করা হয়েছে। করোনার কারণে আপিল শুনানির জন্য গঠিত বেঞ্চ ভেঙে গেলে থমকে যায় শুনানি। বর্তমান প্রধান বিচারপতি বেঞ্চ গঠন করে দিলে দ্রুত আপিল শুনানির কার্যক্রম শুরু হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মামলার বাদী মাহমুদুল হাসান নোমান ও বাদী পক্ষের আইনজীবী শাহজাহান সাজু।